ফ্যাসিবাদের সময় রেখে যাওয়া মৃতপ্রায় সামষ্টিক অর্থনীতি, পর্বতসম ঋণের বোঝা আর তলানিতে থাকা রিজার্ভ বাংলাদেশের জাতীয় অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতের সৃষ্টি করে। ফ্যাসিবাদ পরবর্তী অন্তর্বর্তী সরকারের টালমাটাল সময়ে জাতীয় অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। প্রায় ১৭ বছর পরে অনুষ্ঠিত একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের মধ্য দিয়ে গত ১২ ফেব্রুয়ারি বিএনপি-নেতৃত্বাধীন জোট নিরঙ্কুশভাবে সরকার গঠন করে। ফ্যাসিবাদী সময়ের সুবিশাল বৈদেশিক ঋণ, দুর্বল রেমিট্যান্স আর ভঙ্গুর ব্যাংকিং ব্যবস্থা বিএনপি-নেতৃত্বাধীন সরকারের জন্য ‘উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া বোঝা’ হিসেবে আবির্ভূত হয়। সরকার গঠনের প্রায় সমসাময়িক সময়েই যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধ বিশ্বব্যাপী ভয়াবহ সংকট সৃষ্টি করে, সদ্য গঠিত সরকারের জন্য এ পরিস্থিতি সামাল দেওয়া ছিল আরও বেশী চ্যালেঞ্জের।বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য অন্যতম চালিকাশক্তি হোল রেমিট্যান্স। নির্বাচিত বর্তমান সরকারের সময়কালে দেশে রেমিট্যান্স আয়ের ইতিবাচক ঊর্ধ্বমুখী প্রবাহ বিদ্যমান রয়েছে। ফেব্রুয়ারি’২৬ থেকে জুন’২৬ পর্যন্ত বৈধ পথে দেশে মোট রেমিট্যান্স এসেছে ১৬.১২ বিলিয়ন ডলার, যার মধ্যে মার্চ’ ২৬-এ এসেছে ৩.৭৫ বিলিয়ন ডলার, যা ২০২৫-২৬ অর্থবছরের মধ্যে সর্বাধিক। দেশের সার্বিক স্থিতিশীলতা ও সরকারের প্রতি জনগণের আস্থা বৃদ্ধির কারণেই প্রবাসীদের রেমিট্যান্স ঊর্ধ্বমুখী বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। ফ্যাসিবাদী সরকারের পতন কালে দেশের রিজার্ভ নেমেছিল ২০ দশমিক ৪৮ বিলিয়ন ডলারে (বিপিএম৬ পদ্ধতি অনুযায়ী)। বর্তমানে এ রিজার্ভের পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩১.৯৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার (বিপিএম৬)। সরকার গঠন পরবর্তী এই অল্পদিনেই রিজার্ভ বৃদ্ধি পেয়েছে প্রায় ১.৮৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার (বিপিএম৬)। সরকারের অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের চেষ্টা ও রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের আস্থা ফিরে পাওয়ায় অল্প দিনেই এর ইতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে জাতীয় অর্থনীতিতে। মূল্যস্ফীতির চাপ থেকে জনগণকে স্বস্তি প্রদান, বিনিয়োগ ও ব্যাবসা সম্প্রসারণের মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃজন, সামাজিক সেবা বলয়ের পরিধি বৃদ্ধি এবং অধিকতর উৎপাদনমুখী ও বিকেন্দ্রীভূত অর্থনীতি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য নিয়ে সরকার ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার ইতিহাসের সর্ববৃহৎ বাজেট ঘোষণা করেছে। এ বাজেটে সামগ্রিক অর্থনীতির পুনরুদ্ধার ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা, আর্থিক ব্যবস্থার সংস্কার এবং অর্থনীতির কাঠামোগত উন্নয়নের জন্য 3R (Recovery & Stabilization, Restoration, Reconstruction) কৌশলকে প্রাধান্য দেয়া হয়েছে। কল্যাণরাষ্ট্রের রূপকল্প বাস্তবায়নে এ বাজেটে সামাজিক অবকাঠামো খাতে সর্বাধিক ২৯.৭৪% বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এ বাজেটে অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত খাতগুলোর মধ্যে রয়েছে সবার জন্য উন্নয়ন, সার্বজনীন শিক্ষা, বিনিয়োগ নির্ভর ও কর্মসংস্থানমুখী অর্থনীতি, আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা, জ্বালানি নিরাপত্তা, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থার সম্প্রসারণ। ফ্যাসিবাদী আমলে আর্থিক খাতে সবচেয়ে ভয়াল থাবা পরে ব্যাংকিং সেক্টরে। খেলাপি ঋণের মাধ্যমে একের পর এক ব্যাংক লুটের মধ্যদিয়ে পারতপক্ষে এই সেক্টরকে একরকম পঙ্গু করে দেওয়া হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মার্চের শেষে মোট শ্রেণীকৃত ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকায়। এই বিশাল অংকের খেলাপি ঋণ নতুন সরকারের জন্য পর্বতসম বোঝা হিসেবে দাঁড়িয়েছে। ফ্যাসিবাদী ব্যাংক লুটেরাদের থাবায় অনেক ব্যাংকের জন্যই পর্যাপ্ত তহবিলের অভাবে তাদের স্বাভাবিক কার্যক্রম পরিচালনা করা চ্যালেঞ্জের মুখে পরে। সামগ্রিক আর্থিক খাতের জন্য এটি একটি অশনি সংকেত। ব্যাংকিং খাতকে স্বাভাবিক রাখতে ব্যাংক সরকার দুর্বল ব্যাংকগুলোতে পুনঃমূলধনায়নে ৪০,০০০ কোটি টাকার তহবিল গঠন করে। ফ্যাসিবাদ পতনের পূর্বে জুলাই ২০২৪-এ দেশের মূল্যস্ফীতি ছিল ১১.৬৬%। পরবর্তীতে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় তা কিছুটা কমে আসে। বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট সরকার গঠনের পরেই যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধের কারণে বেসামাল হয় বৈশ্বিক অর্থনীতি। বিশ্বব্যাপী জ্বালানি তেলের সংকট ও মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব পরে বাংলাদেশেও। তবে প্রথম দিকেই জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি না করার জনবান্ধব সিদ্ধান্ত অর্থনীতিকে ঢালাওভাবে মূল্যস্ফীতির দিকে নিয়ে যায়নি। জুন’২৬-এ মূল্যস্ফীতি কমে হয়েছে ৯ দশমিক ১৬ শতাংশ, যা মে মাসে ছিল ৯ দশমিক ৪২ শতাংশ। এ অর্থবছরের জন্য ঘোষিত বাজেটে মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনা লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে সরকার; সেটি সম্ভব হলে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা মূল্যস্ফীতি জনিত বোঝা থেকে জনগণ কিছুটা হলেও স্বস্তি পাবে। সরকার গঠনের সময় হতে অর্থাৎ ফেব্রুয়ারি-জুন ২০২৬ পর্যন্ত মোট রপ্তানি আয় প্রায় ২০.০৫ বিলিয়ন ডলার। চলতি বছরের জুন মাসে রপ্তানি আয় গত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ২৬%। রপ্তানি আয়ের ইতিবাচক ঊর্ধ্বমুখী ধারা ধরে রাখা গেলে, বিগত সময়ের অর্থনৈতিক ক্ষত পুষিয়ে নেয়া সম্ভব হয়ে উঠবে বলে আশা রাখা যায়। বিএনপি তার নির্বাচনি ইশতাহারে বিনিয়োগ বৃদ্ধির মাধ্যমে অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানের বিকাশ ঘটানোর বিষয়ে পরিকল্পনা উপস্থাপন করে। দেশের অর্থনীতিকে অধিকতর বিনিয়োগবান্ধব করতে সরকার সম্প্রতি ‘ইনভেস্ট বাংলাদেশ আইন, ২০২৬’ এর খসড়া চূড়ান্ত অনুমোদন করেছে। এর ফলে আগামীতে বিনিয়োগকারীদের জন্য সিংগেল উইন্ডো ক্লিয়ারেন্স, ওয়ান-স্টপ সার্ভিস, অনুমোদন ও লাইসেন্সিং প্রক্রিয়ার ডিজিটালাইজেশন ইত্যাদি সেবা উন্মোচিত হবে। এই উদ্যোগ বাস্তবায়ন হলে দেশী-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছে বাংলাদেশ ব্যাবসা বান্ধব হয়ে উঠবে। ২০২১-২২ অর্থবছর থেকে টানা চার বছর দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধির পতন হতে থাকে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ছিল ৪.১৪%, যা চলমান ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৬.৫%। এ লক্ষ্যমাত্রা বা কাছাকাছি মান ধরে রাখা গেলেও দেশের অর্থনীতির জন্য এটি হবে বড় ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তন। সরকারকে এই অল্প কিছু দিনের মধ্যেই বৈশ্বিক যুদ্ধ পরিস্থিতি, ফ্যাসিবাদের রেখে যাওয়া ঋণ ও দুর্নীতির বোঝা এবং বাজেটের মত চ্যালেঞ্জকে সামাল দিতে হয়েছে। তবে প্রতিটি ক্ষেত্রেই সংকট মোকাবেলায় ইতিবাচক মনোভাব জনবান্ধব সিদ্ধান্ত প্রণয়নের ক্ষেত্রে প্রভাব রেখেছে। অর্থনীতির এই মাপকাঠিতে সংখ্যাগত অর্জনের চেয়েও সংকট মোকাবেলায় ইতিবাচক প্রচেষ্টা এবং সামগ্রিকভাবে জনগণের আস্থা ফিরে পাওয়া ছিল বেশী জরুরি। এ ধারা অব্যাহত থাকলে, বিগতদিনের অর্থনৈতিক ক্ষত পুষিয়ে নেয়া এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতে গতিশীলতা ফিরে পাওয়া খুব বেশী কষ্টকর হবে না বলে আশা রাখা যায়।
লেখক: বিশ্লেষক

