দেশের বাজারে বহুল বিক্রি হওয়া সিংহভাগ টুথপেস্টে মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর উপাদান ‘মাইক্রোপ্লাস্টিক’-এর উপস্থিতি শনাক্ত করেছে পরিবেশ ও সামাজিক উন্নয়ন সংস্থা (ইএসডিও)। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, স্থানীয় বাজারে বিদ্যমান বিভিন্ন ব্র্যান্ডের টুথপেস্টে এই অতিক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা রয়েছে, যা দৈনন্দিন ব্যবহারের সময় অসাবধানতাবশত মানবদেহে প্রবেশ করে দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে। এমনকি শিশুদের জন্য বিশেষভাবে বাজারজাত করা কিছু পণ্যেও এ ধরনের ক্ষতিকর উপাদানের প্রমাণ মিলেছে, যা সচেতন মহলে গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।
ইএসডিও-র ওই গবেষণায় দেশের বাজারে বহুল প্রচলিত ১৯টি ব্র্যান্ডের মোট ৩৪টি টুথপেস্টের নমুনা পরীক্ষা করা হয়। এর মধ্যে ২৬টি নমুনায়, অর্থাৎ প্রায় ৭৬.৫ শতাংশ পণ্যে মাইক্রোপ্লাস্টিকের স্পষ্ট উপস্থিতি পাওয়া গেছে। চিকিৎসা ও বিজ্ঞান বিশেষজ্ঞদের মতে, মাইক্রোপ্লাস্টিক হলো ৫ মিলিমিটারের চেয়ে ছোট প্লাস্টিক কণা, যা খালি চোখে সাধারণ দেখা যায় না। টুথপেস্টে মূলত পেস্টের ঘনত্ব বাড়ানো, দাঁত পরিষ্কার বা পলিশ করার অনুভূতি তৈরি করা কিংবা উৎপাদন খরচ কমানোর উদ্দেশ্যে এসব ক্ষতিকর সিনথেটিক পলিমার ব্যবহার করা হয়ে থাকতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
দাঁত ব্রাশের সময় মাইক্রোপ্লাস্টিক মানবদেহে প্রবেশ করে কীভাবে প্রভাব ফেলতে পারে—এ বিষয়ে বিস্তারিত বিশ্লেষণ করেছেন সিলেট সেন্ট্রাল ডেন্টাল কলেজের কনজারভেটিভ ডেন্টিস্ট্রি অ্যান্ড এন্ডোডন্টিকস বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও একাডেমিক কো-অর্ডিনেটর ড. মানজুমা আকতার জাকারিয়া। তিনি জানান, ব্রাশ করার পর বেশিরভাগ টুথপেস্ট থুতুর সাথে ফেলে দেওয়া হলেও অসাবধানতাবশত সামান্য অংশ গিলে ফেলার সম্ভাবনা থেকে যায়। বিশেষ করে শিশুরা প্রায়শই টুথপেস্ট গিলে ফেলে। এভাবে মাইক্রোপ্লাস্টিক পরিপাকতন্ত্রে প্রবেশ করলে তা শরীরে প্রদাহ বা ইনফ্ল্যামেশন, অক্সিডেটিভ স্ট্রেস এবং অন্ত্রের স্বাভাবিক জীবাণুর ভারসাম্যে ব্যাঘাত ঘটাতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের চটকদার তথ্যে আতঙ্কিত না হয়ে টুথপেস্ট ক্রয়ের সময় উপাদান তালিকা যাচাই করার অভ্যাস গড়ে তোলা প্রয়োজন। প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য সাধারণত ১০০০ থেকে ১৫০০ পার্টস পার মিলিয়ন (পিপিএম) ফ্লুরাইডযুক্ত টুথপেস্ট উপযুক্ত। এছাড়া দাঁত পরিষ্কারে হাইড্রেটেড সিলিকা বা ক্যালসিয়াম কার্বোনেটের মতো নিরাপদ অ্যাব্রেসিভ উপাদান রয়েছে কি না, তা দেখে নেওয়া উচিত। মোড়কে পলিইথিলিন (পিই), পলিপ্রোপাইলিন (পিপি) বা কোনো প্রকার প্লাস্টিক বিডসের উপস্থিতি থাকলে তা এড়িয়ে চলাই শ্রেয়। একইসঙ্গে মুখের ভেতরে বারবার ঘা বা জ্বালাপোড়া হওয়ার প্রবণতা থাকলে সোডিয়াম লরিল সালফেট (এসএলএস) মুক্ত পণ্য ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
বর্তমানে বাংলাদেশে টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিক ব্যবহার সংক্রান্ত কোনো নির্দিষ্ট জাতীয় মানদণ্ড বা বাধ্যতামূলক পরীক্ষার নীতি নেই। তবে বিএসটিআই সূত্রে জানা গেছে, টুথপেস্টের মান নিয়ন্ত্রণে জাতীয় নীতিমালায় মাইক্রোপ্লাস্টিক তদারকির বিষয়টি যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা কেবল ‘হারবাল’ বা ‘ন্যাচারাল’ ট্যাগ দেখে বিভ্রান্ত না হয়ে বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই) অনুমোদিত এবং বিশ্বস্ত পরীক্ষার মাধ্যমে প্রমাণিত নিরাপদ টুথপেস্ট ব্যবহারের আহ্বান জানিয়েছেন।

