বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলীয় জেলা পটুয়াখালী, বরগুনা ও উপকূলীয় কুয়াকাটা অঞ্চলে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বসবাসকারী আদিবাসী রাখাইন জনগোষ্ঠীর ঐতিহাসিক স্থাননামগুলোর ব্যাপক বিকৃতি ও পরিবর্তন ঘটছে। স্থানীয় বাস্তুতন্ত্র, ঐতিহ্য এবং রাখাইন ভাষার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ এসব স্থাননাম সুপরিকল্পিতভাবে বা অজ্ঞতাবশত বাঙালি সংস্কৃতির আদলে রূপান্তর করায় বিলুপ্তির মুখে পড়েছে এই জনগোষ্ঠীর শতবছরের সমৃদ্ধ ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক পরিচয়। সচেতন মহল ও নৃতাত্ত্বিক গবেষকদের মতে, আদি নাম মুছে দেওয়া কেবল কোনো স্থানের নামকরণ বদল নয়, বরং একটি প্রাচীন জনগোষ্ঠীর ঐতিহাসিক অস্তিত্বকে ভৌগোলিক মানচিত্র থেকে মুছে ফেলার শামিল।
উপকূলীয় এলাকা অনুসন্ধানে দেখা যায়, প্রাচীন বহু রাখাইন গ্রাম, বন, নদী ও জলাভূমির মূল নাম বিকৃত করা হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, স্থানীয় আদি অধিবাসী ল্যুম ফ্রু মাতবরের নামের সংরক্ষিত বন আজ পর্যটন বিভাগের সাইনবোর্ডে ‘লেবুর বন’ হিসেবে উপস্থাপিত হচ্ছে। একইভাবে রাখাইন শব্দ ‘তাতলী’ পরিবর্তন হয়ে হয়েছে ‘তালতলী’। দুই রাখাইন সহোদর ক্যহ্লাউ ও খ্যাপ্রুর নামানুসারে গড়ে ওঠা ‘ক্যহ্লাউপাড়া’ ও ‘খ্যাপ্রুপাড়া’ পরিবর্তিত হয়ে আজকের ‘কলাপাড়া’ ও ‘খেপুপাড়া’ নাম ধারণ করেছে। এছাড়া ‘হ্যুইছেনপাড়া’ হয়েছে ‘হোসেনপাড়া’, ‘জোজিতংব’ বা ঋষির টিলা রূপান্তরিত হয়েছে ‘জাকিরতবক’-এ, এবং বিখ্যাত কবিরাজ মাও প্রু সাইয়ের স্মৃতিবিজড়িত গ্রাম ‘মাও প্রু সাই রোওয়া’ পরিবর্তিত হয়ে ‘পক্ষিয়াপাড়া’ নামে পরিচিতি পেয়েছে। প্রশাসন ও পর্যটন খাতও না জেনে এসব পরিবর্তিত নামই প্রচার করছে।
স্থাননাম বিলুপ্তির সমান্তরালে দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে রাখাইন সম্প্রদায়ের জনসংখ্যা। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ১৯৯১ সালের আদমশুমারিতে দেশে রাখাইন জনসংখ্যা ছিল প্রায় ১৭ হাজার। তবে সর্বশেষ ২০২২ সালের জনশুমারিতে তা আশঙ্কাজনকভাবে কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ১৩ হাজার ৬১০ জনে। জমি বেদখল, পুকুর ও শ্মশান দখল এবং বিহারের ভূমি আগ্রাসনের পাশাপাশি বড় বড় উন্নয়ন প্রকল্পের ভূমি অধিগ্রহণের ফলে অনেক রাখাইন গ্রাম চিরতরে বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। এতে করে বাপ-দাদার ভিটেমাটি ছেড়ে ভিটেহীন হয়ে পড়ছেন এই প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মানুষেরা।
ইতিহাসবিদ ও বিশিষ্ট গবেষকদের মতে, যেকোনো ভৌগোলিক স্থাননাম দেশের সামগ্রিক ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য পদচিহ্ন। স্থাননামের ভুল ও বিকৃত রূপ জাতীয় ঐতিহ্যকে বিকৃত করে। তাই রাখাইন জনপদের ছিনতাই হওয়া ও বিকৃত হওয়া স্থাননামগুলোর প্রশাসনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ন্যায্যতা ফিরিয়ে দেওয়া অত্যন্ত জরুরি। স্থানীয় সরকার ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় উদ্যোগ নিয়ে ঐতিহাসিক রাখাইন স্থাননামগুলো পুন প্রতিষ্ঠায় কার্যকর পদক্ষেপ নিলে তা একদিকে যেমন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর অধিকার রক্ষা করবে, অন্যদিকে কুয়াকাটাসহ দক্ষিণাঞ্চলের পর্যটন শিল্পেও একটি ইতিবাচক ও ঐতিহ্যবাহী মাত্রা যোগ করবে।

