ছোটবেলায় টেলিভিশনের পর্দায় ‘ডিসকভারি’ এবং ‘অ্যানিমেল প্ল্যানেট’ চ্যানেলে প্রচারিত বন্যপ্রাণী ও প্রকৃতির প্রামাণ্যচিত্র দেখতে দেখতে প্রাণিজগতের এক অপূর্ব মোহে আচ্ছন্ন হয়েছিলেন তাসিন মোহাম্মাদ। বাঘ, ভালুক, তিমি কিংবা অতি ক্ষুদ্র কীটপতঙ্গের জীবনযাত্রা এবং তাদের বেঁচে থাকার লড়াই তাঁকে গভীরভাবে ভাবাত। সেই শৈশবের কৌতূহল ও ভালোলাগা থেকেই ধীরে ধীরে বিজ্ঞানের এই শাখার প্রতি তাঁর দুর্নিবার আকর্ষণ তৈরি হয়। অষ্টম শ্রেণিতে ওঠার পর থেকেই তিনি জীববিজ্ঞানের বিভিন্ন জটিল বিষয় নিয়ে পড়াশোনা শুরু করেন। মানবদেহের কিডনি, ফুসফুস এবং হৃদ্যন্ত্রের বিস্ময়কর কার্যপ্রণালি অধ্যয়ন করেই তাঁর অলস সময় কেটে যেত। এই সুপ্ত প্রতিভাই তাঁকে পরবর্তীতে বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অলিম্পিয়াডের আঙিনায় নিয়ে এসেছে। বর্তমানে তাসিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের স্নাতক প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী। তবে শুধু জীববিজ্ঞানেই নয়, এর পাশাপাশি রসায়ন, গণিত, পদার্থবিজ্ঞান এবং জ্যোতির্বিজ্ঞান অলিম্পিয়াডেও তাঁর নিয়মিত অংশগ্রহণ রয়েছে। বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী তাসিন পড়াশোনার পাশাপাশি আবৃত্তি এবং চিত্রাঙ্কনের মতো বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গেও নিজেকে যুক্ত রেখেছেন।
চলতি বছরের মে মাসে রাশিয়ায় অনুষ্ঠিত মর্যাদাপূর্ণ ‘ওপেন ইন্টারন্যাশনাল বায়োলজি অলিম্পিয়াড’ বা ওআইবিও (OIBO)-তে অংশ নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এক দারুণ সাফল্য অর্জন করেছেন তাসিন মোহাম্মাদ ও তাঁর সহকর্মী রূপকথা রায়। বিশ্বজুড়ে ষষ্ঠ থেকে দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য আয়োজিত এই প্রতিযোগিতায় প্রায় ২০টি দেশের শতাধিক মেধাবী শিক্ষার্থী অংশ নেন। বাংলাদেশ দল থেকে ছয়জন শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণের কথা থাকলেও মূলত আর্থিক সংকটের কারণে শেষ পর্যন্ত মাত্র দুজন শিক্ষার্থী রাশিয়ায় যাওয়ার সুযোগ পান। এই যাত্রায় তাঁদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছিল সাউথইস্ট ব্যাংক, যাদের আর্থিক সহায়তার ফলেই তাসিন ও রূপকথা রাশিয়ায় অনুষ্ঠিত মূল প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে সক্ষম হন। দলটির মেন্টরের দায়িত্বে ছিলেন ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের (আইইউবি) প্রভাষক আফিয়া নওশীন। অত্যন্ত প্রতিযোগিতাপূর্ণ এই আসরটি তিনটি ভিন্ন পর্বে অনুষ্ঠিত হয়েছিল—ব্যবহারিক বা প্র্যাকটিক্যাল পর্ব, তাত্ত্বিক বা থিওরেটিক্যাল পর্ব এবং প্রজেক্ট রাউন্ড। এর মধ্যে ব্যবহারিক ও তাত্ত্বিক পর্বের সামগ্রিক মূল্যায়নে তাসিন ব্যক্তিগতভাবে ব্রোঞ্জপদক অর্জন করেন এবং প্রজেক্ট রাউন্ডে তাঁদের দল ‘প্রজেক্ট উইনার’-এর স্বীকৃতি লাভ করে।
প্রতিযোগিতার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে তাসিন জানান যে, এর মধ্যে উদ্ভিদবিদ্যা ও প্রাণিবিদ্যার ওপর পৃথকভাবে অনুষ্ঠিত আট ঘণ্টার দীর্ঘ ব্যবহারিক পরীক্ষাটি ছিল সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন, বাংলাদেশের স্কুল-কলেজ বা সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয় ল্যাবরেটরিতে যে ধরনের সুযোগ-সুবিধা বা উন্নত যন্ত্রপাতি রয়েছে, তার চেয়ে অনেক বেশি অ্যাডভান্সড টুলস ও প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছিল রাশিয়ার সেই ল্যাবরেটরিতে। যাঁর ফলে প্রথমদিকে কিছুটা ভোগান্তিতে পড়তে হলেও তাঁরা নিজেদের মেধা ও প্রজ্ঞার জোরে সেই চ্যালেঞ্জ সফলভাবে মোকাবিলা করেন। বিশেষ করে মাইক্রোস্কোপের নিচে ছত্রাক ও মাছির লার্ভাসহ বিভিন্ন জটিল নমুনা নিখুঁতভাবে বিশ্লেষণ করতে হয় প্রতিযোগীদের। তবে এই আসরের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর এবং আকর্ষণীয় অংশ ছিল প্রজেক্ট রাউন্ড। ‘প্র্যাকটিক্যাল মেথডস অব মডার্ন বোটানি’ শীর্ষক এই পর্বে প্রতিযোগীদের একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের গাছের ওপর পরিবেশগত বিভিন্ন উপাদানের বা ফ্যাক্টরের প্রভাব সরেজমিন পর্যবেক্ষণ ও তথ্য সংগ্রহের মাধ্যমে বৈজ্ঞানিক সিদ্ধান্ত নিতে বলা হয়। এই কাজের জন্য তাসিনদের একটি সংরক্ষিত গভীর বনাঞ্চলে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, যেখানে তাঁরা বন্য ভালুকের পায়ের টাটকা ছাপও দেখতে পান। কঠোর পরিশ্রম ও প্রতিকূলতা পেরিয়ে মাত্র দুই সদস্যের দল নিয়ে তাঁরা সফলভাবে এই রাউন্ড সম্পন্ন করেন এবং বিজয়ীর খেতাব অর্জন করেন।
পরিবেশ এবং জলবায়ু রক্ষার প্রতি গভীর অনুরাগ থেকেই তাসিন ভবিষ্যতে পরিবেশগত বৈশ্বিক সংকট নিরসনে কাজ করার সুদূর প্রসারী পরিকল্পনা হাতে নিয়েছেন। এর আগে গত বছর রাশিয়ায় অনুষ্ঠিত ‘ইন্টারন্যাশনাল অলিম্পিয়াড অন ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যান্ড এনভায়রমেন্টাল ইস্যুজ’ (IOCE)-এ তিনি এককভাবে স্বর্ণপদক অর্জন করেছিলেন। সেই প্রতিযোগিতায় তাঁর পাঁচ সদস্যের দল দাবানল পূর্ববাস দেওয়ার একটি অত্যাধুনিক যন্ত্রের প্রকল্প উপস্থাপন করে প্রশংসিত হয়েছিল। বর্তমানে তিনি নিজের উদ্যোগে ‘সাসটেইনেবিলিটি অ্যান্ড লাইফ সায়েন্সেস নেটওয়ার্ক’ (SLSN) নামের একটি বিশেষ সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেছেন, যার মাধ্যমে সারা দেশের শিক্ষার্থীদের নিয়ে খুব শীঘ্রই ‘জাতীয় জলবায়ু অলিম্পিয়াদ’ অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। ঐতিহ্যবাহী পরিবেশবাদী সংগঠনের মতো কেবল গাছ লাগানো বা ময়লা পরিষ্কারের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে, তাঁর এই সংগঠনের মূল লক্ষ্য হলো ভবিষ্যৎ গবেষক তৈরি করা। তাসিনের বিশ্বাস, এর মাধ্যমে একটি শক্তিশালী তরুণ গবেষক সম্প্রদায় গড়ে উঠবে, যারা আগামী দিনে বৈশ্বিক জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করবে।

