বঙ্গোপসাগরের মহেশখালী উপকূলের কাছে ইঞ্জিন বিকল হয়ে যাওয়া একটি ট্রলার থেকে উদ্ধার হওয়া শ্রীলঙ্কার দুই নাগরিক বর্তমানে বাংলাদেশ পুলিশের হেফাজতে রয়েছেন। গত শনিবার রাতে মহেশখালী থানা-পুলিশ তাঁদের নিজেদের হেফাজতে নেয়। এর আগে গত শুক্রবার স্থানীয় এক জেলের সহায়তায় ওই দুই জেলেকে উপকূলে নিয়ে আসা হয়। দীর্ঘ ৩৬ দিন ধরে ট্রলার নিয়ে সমুদ্রে ভেসে থাকার রোমহর্ষক ও মর্মান্তিক অভিজ্ঞতা নিয়ে তাঁরা এখন দেশে ফেরার অপেক্ষায় দিন গুনছেন।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, উদ্ধার হওয়া দুই শ্রীলঙ্কান নাগরিক সম্পর্কে বাবা ও ছেলে। তাঁদের পরিচয় এস এইচ চামিন্দা এবং তাঁর পুত্র সাউন্ডা হান্নাদিগিপিয়াওয়াটিং। তাঁদের আসল বাসস্থান শ্রীলঙ্কার ডেভিনুওয়ারা এলাকার রুরাল হসপিটাল রোড। প্রায় ৩৬ দিন আগে তাঁরা অন্যান্য জেলের সঙ্গে একটি ছোট ট্রলারে চড়ে গভীর সমুদ্রে মাছ ধরতে রওনা হয়েছিলেন। কিন্তু মাঝপথে বৈরী আবহাওয়া ও যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে তাঁদের ট্রলারের ইঞ্জিন সম্পূর্ণ বিকল হয়ে যায়। এরপর নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়া ট্রলারটি ভাসতে ভাসতে আন্দামান সাগর হয়ে বঙ্গোপসাগরের দিকে চলে আসে।
বিপদজনক এই যাত্রার প্রাথমিক পর্যায়ে তাঁদের সঙ্গে আরও দুই জেলে থাকলেও, ঘটনার শুরুতেই অন্য একটি নৌকার সহায়তায় তাঁরা দেশে ফিরে যেতে সক্ষম হন। তবে নিজেদের ট্রলারটি সচল করার আশায় বাবা-ছেলে দুজনই ওই ট্রলারে থেকে যান। কিন্তু দুর্ভাগ্য তাঁদের পিছু ছাড়েনি। ঘটনার সাত-আট দিন পর মিয়ানমারের জলসীমায় বা সংলগ্ন এলাকায় কিছু লোক তাঁদের ট্রলারে উঠে তাঁদের সঙ্গে থাকা দুরবিন, ক্যামেরা এবং অন্যান্য মূল্যবান জিনিসপত্র লুট করে নিয়ে যায়। ফলে তারা সম্পূর্ণ সহায়সম্বলহীন হয়ে পড়েন।
সমুদ্রের বুকে এক অনিশ্চিত জীবনে টিকে থাকার লড়াই শুরু হয় তাঁদের। যাত্রা শুরুর মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যে ট্রলারে মজুত করা সমস্ত খাবার ফুরিয়ে যায়। এরপর টানা ২৯ দিন ধরে তাঁদের চরম খাদ্যসংকটের মধ্যে দিন কাটাতে হয়। বেঁচে থাকার তাগিদে তাঁরা সাগরে মাছ ধরার বড়শির টোপ হিসেবে ব্যবহৃত খাদ্যসামগ্রী এবং সমুদ্র থেকে ধরে আনা কাঁচা মাছ খেয়ে জীবন রক্ষা করেন। দীর্ঘদিন পুষ্টিকর খাবার ও পানীয় জলের অভাবে তাঁদের শারীরিক ও মানসিক অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয় হয়ে পড়েছিল।
গত বুধবার রাতে গভীর সাগর থেকে মাছ শিকার শেষে ফেরার পথে মহেশখালীর কুতুবজোম ইউনিয়নের দক্ষিণপাড়ার বাসিন্দা ও ট্রলারমালিক জিয়াউর রহমানের নজরে পড়ে ভাসমান ওই শ্রীলঙ্কান ট্রলারটি। তিনি এগিয়ে গিয়ে দেখেন ট্রলারে দুজন মুমূর্ষু মানুষ পড়ে আছেন এবং তাঁদের একজন মারাত্মকভাবে অসুস্থ। জীবন বাঁচাতে তাঁরা দুহাত জোড় করে আকুতি জানান। মানবিক কারণে জিয়াউর রহমান ও তাঁর সহকর্মীরা তাঁদের নিজেদের ট্রলারে তুলে নেন এবং অচল ট্রলারটি রশি দিয়ে বেঁধে শুক্রবার রাতে মহেশখালীর তাজিয়াকাটা ঘাটে নিয়ে আসেন।
প্রাথমিকভাবে ভাষা না জানায় তাঁদের পরিচয় নিয়ে কিছুটা জটিলতা তৈরি হলেও, ট্রলারমালিক জিয়াউর রহমান তাঁর দুবাইপ্রবাসী আত্মীয় সেলিমের সহায়তায় দোভাষীর মাধ্যমে বিদেশি দুই জেলের পরিচয় ও বিপদের কারণ নিশ্চিত করেন। এরপর থেকেই তাঁরা জিয়াউর রহমানের বাড়িতে আতিথেয়তায় ছিলেন। শ্রীলঙ্কান ওই দুই নাগরিক দ্রুত নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার জন্য প্রশাসনের কাছে আকুল আবেদন জানিয়েছেন। একই সঙ্গে তাঁদের ব্যবহৃত নৌকাটি সঙ্গে নেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করলেও, উত্তাল সাগর পাড়ি দিয়ে এই ছোট নৌকায় শ্রীলঙ্কা ফেরা অসম্ভব বলে জানিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন। মহেশখালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আবদুস সুলতান জানিয়েছেন, উদ্ধার হওয়া জেলেদের বিষয়ে প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া চলছে এবং ঊর্ধ্বতন মহলের সঙ্গে আলোচনা করে দ্রুত এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

