বাংলাদেশের নতুন নির্বাচন-পরবর্তী রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সদস্য রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক জোরদারের প্রেক্ষাপটে এবার জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সফর করেছেন ফ্রান্স ও জার্মানির উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক প্রতিনিধিরা। সোমবার দুপুরে রাজধানীর বাংলামোটরে এনসিপির মূল কার্যালয়ে আয়োজিত এই দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে ঢাকায় নিযুক্ত ফ্রান্সের রাষ্ট্রদূত জ্যঁ-মার্ক সেরে-শার্লে এবং জার্মানির চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স আনজা কের্স্টেন অংশগ্রহণ করেন। কূটনৈতিক এ সৌজন্য বৈঠকটিতে সমসাময়িক ভূরাজনীতি, জাতীয় সংসদীয় চর্চা এবং অর্থনৈতিক অংশীদারত্বের বিভিন্ন দিক গুরুত্বের সঙ্গে আলোচিত হয়েছে।
বৈঠকে এনসিপির শীর্ষ প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন দলের আহ্বায়ক ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম। তাঁর সঙ্গে আলোচনায় অংশ নেন জাতীয় নাগরিক পার্টির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া, আন্তর্জাতিক বিষয়ক সেলের ইনচার্জ আলাউদ্দীন মোহাম্মদ এবং সেলের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য নাভিদ নওরোজ শাহ। কূটনীতিকদের এ সফরটি নির্বাচন-পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন বিরোধী দলের অবস্থান ও দৃষ্টিভঙ্গি মূল্যায়নে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের গভীর আগ্রহের বহিঃপ্রকাশ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
বৈঠকের সিদ্ধান্ত ও আলোচনার সার্বিক বিষয় তুলে ধরে এনসিপির আন্তর্জাতিক দলের পক্ষ থেকে একটি প্রাতিষ্ঠানিক সংবাদ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, বৈঠকে মূল আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু ছিল দেশের বর্তমান রাজনৈতিক গতিধারা, জাতীয় সংসদে এনসিপির কার্যকর ও গঠনমূলক ভূমিকা এবং রাষ্ট্রের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ খাতে মৌলিক সংস্কার বাস্তবায়নের রূপরেখা। সেই সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে বাংলাদেশের বহুমাত্রিক সুসম্পর্ক বজায় রাখা ও পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট অর্থনৈতিক উন্নয়ন নিয়ে ফলপ্রসূ মতামত বিনিময় করা হয়েছে।
এছাড়া আন্তর্জাতিক ও কৌশলগত বিষয় জোরদারের প্রসঙ্গে আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং বহুল আলোচিত ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় (ইনডো-প্যাসিফিক) অঞ্চলের সহযোগিতা বৃদ্ধি নিয়ে যৌথভাবে কথা বলেন এনসিপি নেতা ও ইউরোপীয় প্রতিনিধিরা। পাশাপাশি বাংলাদেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বজায় রাখা, বৈশ্বিক বাজারে দেশীয় পণ্যের প্রবেশাধিকার সহজীকরণ এবং বিদেশি বিনিয়োগের সুযোগ সম্প্রসারণে ইউরোপীয় ইউনিয়ন কীভাবে আরও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট মতামত তুলে ধরা হয়।
সাক্ষাৎকালে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, বিশেষ করে ফ্রান্স ও জার্মানির সঙ্গে বাংলাদেশের ঐতিহাসিক বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে আরও সুদৃঢ় ও টেকসই করতে উভয় পক্ষই ঐকমত্য প্রকাশ করেছে। ধারাবাহিকভাবে পারস্পরিক যোগাযোগ রক্ষা এবং সহযোগিতার বিভিন্ন সম্ভাব্য ক্ষেত্রে যৌথ কাজের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের অবস্থান শক্তিশালী করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করা হয় এই হাই-প্রোফাইল বৈঠক থেকে।
উল্লেখ্য, সম্প্রতি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এনসিপির কার্যালয় ঘিরে কূটনৈতিক তৎপরতা দৃশ্যমানভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এর মাত্র কয়েক দিন আগে, গত ২২ জুলাই এনসিপির একই কার্যালয়ে এসে দলটির শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেছিলেন ঢাকায় নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন। সেই বৈঠকে তৎকালীন মার্কিন দূতাবাসের রাজনৈতিক উপদেষ্টা এরিক গিলান ও রাজনৈতিক সচিব জেমস স্টুয়ার্ট উপস্থিত ছিলেন। ওই আলোচনায় সাবেক অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের শেষ মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য চুক্তি এবং পরবর্তী অর্থনৈতিক পদক্ষেপ প্রাধান্য পেয়েছিল। একের পর এক প্রভাবশালী দেশের কূটনৈতিক প্রতিনিধিদের এই ধারাবাহিক সফর দেশের রাজনৈতিক সমীকরণে বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে।

