খুলনার পাইকগাছায় রান্নার পর গরুর মাংস সবুজ বর্ণ ধারণ করার এক অনভিপ্রেত ঘটনাকে কেন্দ্র করে পুরো জেলাজুড়ে ভোক্তা ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে চরম চাঞ্চল্য ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এ ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর সাধারণ মানুষের মনে নতুন করে আতঙ্কের সৃষ্টি হয়েছে, যার প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়েছে স্থানীয় মাংসের বাজারগুলোতে। বৃষ্টির কারণে বাজারে এমনিতেই ক্রেতার উপস্থিতি কম ছিল, তার ওপর এই অদ্ভুত ঘটনার খবরে মাংসের দোকানে বিক্রি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। অনেক ক্রেতা বাজারে গিয়ে নানা প্রশ্ন তুলছেন এবং অনীহা প্রকাশ করে মাংস না কিনেই ফিরে যাচ্ছেন।
ঘটনার বিস্তারিত বিবরণে জানা যায়, গত ২২ জুলাই (বুধবার) পাইকগাছা পৌর এলাকার মডার্ন বেকারির কর্মচারীরা একটি পিকনিকের আয়োজন করেন। সেই অনুষ্ঠানের জন্য কেনা গরুর মাংস রান্নার সময় তা অস্বাভাবিকভাবে সবুজ রঙে পরিণত হয়। ঘটনার আকস্মিকতায় উপস্থিত সবাই হতবাক হয়ে পড়েন এবং দৃশ্যটির ভিডিও ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করেন। ভিডিওটি দ্রুত ভাইরাল হয়ে পড়লে বিষয়টি নিয়ে জেলাজুড়ে ব্যাপক তোলপাড় শুরু হয়। সাধারণ ভোক্তাদের মধ্যে খাদ্যের নিরাপত্তা ও রাসায়নিকের ব্যবহার নিয়ে দেখা দেয় গভীর অনিশ্চয়তা।
এদিকে, রোববার খুলনা নগরী ও পাইকগাছা উপজেলার বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা গেছে, প্রতি কেজি গরুর মাংস বিক্রি হচ্ছে ৭ ৫০ টাকা দরে। তবে খুচরা বাজারে ক্রেতার সংখ্যা সাধারণ সময়ের তুলনায় বেশ কম। ময়লাপোতা মোড়ের মাংস ব্যবসায়ী সালাউদ্দিন জানান, সাম্প্রতিক সময়ের টানা বৃষ্টির কারণে বাজারে স্বাভাবিকভাবেই মন্দাভাব বিরাজ করছিল। তবে পাইকগাছার ঘটনা প্রকাশ্যে আসার পর থেকে ক্রেতারা নানা ধরনের সংশয় প্রকাশ করছেন। তিনি উল্লেখ করেন, দীর্ঘ ব্যবসাজীবনে রান্নার পর মাংস সবুজ হয়ে যাওয়ার কোনো নজির তিনি আগে কখনো দেখেননি। ঘটনার পেছনে আসল কারণ কী, তা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দ্রুত খতিয়ে দেখা প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।
একই সুর ফুটে উঠেছে নতুন বাজারের ব্যবসায়ী ফারুক শেখের কথায়। তিনি জানান, নগরীতে নির্দিষ্ট ও অনুমোদিত স্থানে পশু জবাই করা হয়, ফলে অসুস্থ বা ত্রুটিযুক্ত পশু মাংস হিসেবে বাজারে আসার সুযোগ নেই। কোনো ব্যবসায়ীই ইচ্ছা করে ক্ষতিকারক বা খারাপ মানের মাংস বিক্রি করতে চাইবেন না, কারণ এতে স্থায়ী গ্রাহক হারানোর ঝুঁকি থাকে। তবে মাংস সবুজ হওয়ার খবর ছড়ানোর ফলে বাজারে সাময়িক নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। আসল রহস্য উদ্ঘাটিত হলে ভোক্তাদের মনের বিভ্রান্তি কেটে যাবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
অন্যদিকে সাধারণ ক্রেতাদের মধ্যেও চরম অবিশ্বাসের সৃষ্টি হয়েছে। নগরীর একজন চাকরিজীবী ফরহাদ হোসেন জানান, বাজারে বিভিন্ন খাদ্যে ক্ষতিকর রাসায়নিকের মিশ্রণ এবং দীর্ঘদিন ধরে ফ্রিজে সংরক্ষিত মাংস বিক্রির নানা অভিযোগ প্রায়ই শোনা যায়। এমন পরিস্থিতিতে রান্নার পর মাংস সবুজ হওয়ার ঘটনায় সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। রসায়নের অপব্যবহার নাকি অন্য কোনো প্রক্রিয়ার কারণে মাংসের এই রঙ পরিবর্তন হয়েছে, তা স্পষ্ট হওয়া দরকার। একই ধরনের শঙ্কা ব্যক্ত করেন গৃহিণী শাকিরুন আক্তার। তিনি জানান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিওটি দেখার পর পরিবার থেকে আপাতত গরুর মাংস কেনা বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
ভোক্তাদের এই আতঙ্কের পটভূমিতে জেলা নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করেছে। খুলনা জেলা নিরাপদ খাদ্য কর্মকর্তা মোকলেছুর রহমান জানিয়েছেন, এমন ঘটনার নজির পূর্বে কখনো দেখা যায়নি। ঘটনার সত্যতা ও আসল কারণ অনুসন্ধানের জন্য ইতোমধ্যেই রান্না করা ও কাঁচা—উভয় ধরনের মাংসের নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। সংগৃহীত নমুনা বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার জন্য একটি বিশেষায়িত ল্যাবরেটরিতে পাঠানো হবে। ল্যাব পরীক্ষার রিপোর্ট হাতে পাওয়ার পরই স্পষ্টভাবে বলা সম্ভব হবে কেন বা কী উপাদানের বিক্রিয়ায় মাংসের রঙ সবুজ হয়েছে। সঠিক তথ্য সামনে এনে জনমনে সৃষ্টি হওয়া সংশয় দূর করতে কাজ চালিয়া যাওয়া হচ্ছে বলে তিনি আশ্বস্ত করেন।

