বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ ও সবচেয়ে ব্যয়বহুল মেগা প্রকল্প পাবনার ঈশ্বরদীতে অবস্থিত রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বিদ্যুৎ উৎপাদনের চূড়ান্ত ধাপে পৌঁছেছে। বিদ্যুৎ বিভাগ ও প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, আগামী মাসের মধ্যেই এই মেগা প্রকল্প থেকে পরীক্ষামূলকভাবে প্রায় ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের প্রস্তুতি জোরকদমে এগিয়ে চলছে। এটি দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও পরিবেশবান্ধব বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রে এক নতুন যুগের সূচনার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
রাশিয়ার পারমাণবিক শক্তি সংস্থা ‘রোসাটম’-এর কারিগরি ও আর্থিক সহায়তায় বাস্তবায়িত এই প্রকল্পে প্রতিটি ১২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন দুটি ইউনিট নির্মাণ করা হচ্ছে, যার সম্মিলিত মোট উৎপাদন ক্ষমতা হবে ২৪০০ মেগাওয়াট। ইতিপূর্বে প্রকল্পের প্রথম ইউনিটের ভৌত অবকাঠামো নির্মাণ কাজ শেষ করে রিয়্যাক্টর প্রেশার ভেসেল স্থাপন ও কোল্ড টেস্ট সফলভাবে সম্পন্ন করা হয়েছে। পাশাপাশি পাবনার রূপপুরে প্রথম ও দ্বিতীয় ইউনিটের জন্য পারমাণবিক জ্বালানি ইউরেনিয়ামের বেশ কয়েকটি চালান পৌঁছে দেওয়া হয়েছে, যার মাধ্যমে বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে বিশ্বের ৩৩তম পারমাণবিক শক্তি ব্যবহারকারী দেশ হিসেবে বিশ্বমঞ্চে স্বীকৃতি অর্জন করে।
প্রকল্প কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, পারমাণবিক কেন্দ্র থেকে একযোগে পূর্ণ ক্ষমতায় বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু করা সম্ভব নয়। প্রাথমিক পর্যায়ে রিয়্যাক্টরের সার্বিক কার্যকারিতা, তাপমাত্রা ও চাপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং জাতীয় গ্রিডের ধারণক্ষমতা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণের জন্য অল্প পরিমাণ বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হয়। তারই অংশ হিসেবে ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। এই পরীক্ষামূলক সংযোগ সফল হওয়ার পর পর্যায়ক্রমে উৎপাদন ক্ষমতা বাড়িয়ে ৫০ শতাংশ, ৭৫ শতাংশ এবং পরবর্তীতে শতভাগে নিয়ে যাওয়া হবে।
উৎপাদিত বিদ্যুৎ ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অর্থনৈতিক অঞ্চলে পৌঁছে দিতে পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশ (পিজিসিবি) উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ৪০০ কেভি ও ২৩০ কেভি সঞ্চালন লাইন এবং পদ্মা নদী পারাপারের বিদ্যুৎ অবকাঠামো নির্মাণের কাজ প্রায় শেষ করে এনেছে। এর ফলে রূপপুর থেকে বিদ্যুৎ সঞ্চালনে কোনো প্রযুক্তিগত বাধা থাকবে না বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছে কর্তৃপক্ষ।
বাণিজ্যিক উৎপাদনের সুনির্দিষ্ট তারিখ সম্পর্কে বিদ্যুৎ বিশেষজ্ঞদের অভিমত, পরীক্ষামূলক গ্রিড সংযোগের পর প্রায় দুই থেকে চার মাস ধরে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ও আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) নিবিড় পর্যবেক্ষণ প্রক্রিয়া বজায় রাখতে হয়। সব ধরনের সুরক্ষা নিশ্চিত হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ চূড়ান্ত সবুজ সংকেত প্রদান করে। আশা করা হচ্ছে, এই পরীক্ষামূলক ধারা অব্যাহত থাকলে দ্রুতই প্রথম ইউনিট থেকে বাণিজ্যিকভাবে শতভাগ বিদ্যুৎ সরবরাহ সম্ভব হবে, যা দেশের সার্বিক শিল্পায়ন, বিদ্যুৎ সংকট হ্রাস এবং জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমাতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করবে।

