উচ্চশিক্ষার সোনালী স্বপ্নের হাতছানি নিয়ে রাশিয়ায় পাড়ি জমানো কুষ্টিয়ার তরুণ অনিক বিশ্বাস অবশেষে চিরতরে কফিনবন্দী হয়ে নিজ মাতৃভূমিতে ফিরেছেন। রাশিয়ার চেলিয়াবিনস্ক শহরে অবস্থিত মর্যাদাপূর্ণ সাউথ ইউরাল স্টেট ইউনিভার্সিটির এ শিক্ষার্থীর অকাল ও রহস্যজনক মৃত্যুতে তাঁর পরিবার, স্বজন এবং পুরো এলাকায় শোকের মাতম চলছে। প্রায় আড়াই বছর আগে সম্পূর্ণ মেধার জোরে স্কলারশিপ বা বৃত্তি নিয়ে তিনি দেশ ছেড়েছিলেন, যার মূল লক্ষ্য ছিল উচ্চশিক্ষা অর্জন করে নিজের ও পরিবারের ভাগ্য পরিবর্তন করা এবং দেশের জন্য কিছু করা। কিন্তু সব স্বপ্ন আর আকাঙক্ষা এখন বিলীন হয়ে গেছে দূর প্রবাসীর এক মর্মান্তিক দুর্ঘটনায়।
পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, প্রায় দেড় মাস আগে রাশিয়ার ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি পাঁচতলা ভবনের ছাদ থেকে নিচে পড়ে অনিক মারাত্মকভাবে আহত হন এবং ঘটনাস্থলেই তাঁর প্রাণহানি ঘটে। গত ২১ জুন প্রবাস থেকে এই হৃদয়বিদারক সংবাদ তাঁর কুষ্টিয়ার গ্রামের বাড়িতে পৌঁছালে শোকের ছায়া নেমে আসে। দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া, দাপ্তরিক জটিলতা এবং মরদেহ পরিবহনের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করার দীর্ঘ ১ মাস ১২ দিন পর অবশেষে গত রোববার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে তাঁর নিথর দেহ কুষ্টিয়া সদর উপজেলার আইলচারা ইউনিয়নের সওড়াতলা গ্রামে পৌঁছায়। প্রিয় সন্তানকে শেষবারের মতো একনজর দেখতে কুষ্টিয়ার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে শত শত মানুষ তাঁদের বাড়িতে ভিড় জমান। এই স্বজন হারানোর বেদনাদায়ক মুহূর্তে পুরো এলাকার বাতাস ভারী হয়ে ওঠে।
পরে বাদ জোহর স্থানীয় সওড়াতলা জামে মসজিদে মরহুমের জানাজার নামাজ অনুষ্ঠিত হয়। জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের মধ্য দিয়ে তাঁর দাফন সম্পন্ন হয়। এই শোকাবহ অনুষ্ঠানে কুষ্টিয়া-৩ (সদর) আসনের সংসদ সদস্য আমির হামজা সশরীরে উপস্থিত থেকে শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান এবং মরহুমের আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন। এছাড়া আইলচারা ইউনিয়ন পরিষদের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য সিরাজুল ইসলাম অনিকের মরদেহ দাফন সম্পন্ন হওয়ার বিষয়টি গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছেন। তবে এই মৃত্যুর পেছনের প্রকৃত কারণ নিয়ে এখনো ধোঁয়াশা রয়েছে। পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এটি নিছক কোনো দুর্ঘটনা ছিল নাকি এর পেছনে অন্য কোনো রহস্য লুকিয়ে আছে, সে বিষয়ে তারা এখনো পুরোপুরি নিশ্চিত হতে পারেননি। বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকেও খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে বলে জানা গেছে।
নিহত অনিক বিশ্বাসের চাচা আলী হোসেন ফারকী ভারাক্রান্ত হৃদয়ে স্মরণ করেন তাঁর ভাতিজাকে। তিনি জানান, অনিক ছোটবেলা থেকেই অত্যন্ত মেধাবী, বিনয়ী ও ভদ্র স্বভাবের অধিকারী ছিলেন। কুষ্টিয়া সরকারি কলেজ থেকে সফলভাবে স্নাতক ডিগ্রি অর্জনের পর যখন তিনি উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্যে ইউরোপীয় দেশটিতে যান, তখন পুরো সওড়াতলা গ্রামবাসী তাঁর সাফল্যে গর্বিত হয়েছিল। শৈশবেই মায়ের স্নেহ থেকে বঞ্চিত হওয়া অনিকের পরিবারে রয়েছে তাঁর বাবা মানোয়ার বিশ্বাস এবং বড় ভাই। মায়ের অভাব ঘুচিয়ে সচ্ছলতা ফিরিয়ে আনার যে প্রত্যয় নিয়ে সে ভিনদেশে পাড়ি দিয়েছিল, সেই স্বপ্ন আজ অধরাই রয়ে গেল। এদিকে, কুষ্টিয়া সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. হারুন অর রশিদ জানিয়েছেন, বিষয়টি নিয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো তথ্য বা আবেদন তাদের কাছে আসেনি, তবে তারা নিজ উদ্যোগে সার্বিক বিষয় খতিয়ে দেখছেন। প্রবাসে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা এবং এ ধরনের মর্মান্তিক মৃত্যুর যথাযথ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন সচেতন মহল।

