মানবসভ্যতার ইতিহাসে দীর্ঘায়ু এবং সুস্বাস্থ্য অর্জনের পেছনে জিনগত প্রভাবের পাশাপাশি জীবনযাত্রা, পুষ্টি এবং রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বখ্যাত চিকিৎসাবিজ্ঞান সাময়িকী ‘দ্য ল্যানসেট’-এ প্রকাশিত এক গবেষণার পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে দক্ষিণ কোরিয়ার নারীরা বিশ্বের প্রথম জনগোষ্ঠী হিসেবে জন্মকালের গড় আয়ুতে ৯০ বছরের ঐতিহাসিক মাইলফলক স্পর্শ করতে পারেন। একসময় জনসংখ্যাবিদ ও গবেষকদের একটি বড় অংশ মনে করতেন, জাতীয় পর্যায়ে মানুষের গড় আয়ু ৯০ বছর অতিক্রম করা প্রায় অসম্ভব এবং এটি মানবদেহের জৈবিক সীমার কাছাকাছি। তবে আধুনিক বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ এবং উন্নত পরিসংখ্যানগত মডেল সেই ধারণাকে সম্পূর্ণ বদলে দিয়েছে। ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডন এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার যৌথ গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে, সুপরিকল্পিত জনস্বাস্থ্য নীতি এবং আর্থসামাজিক উন্নয়নের মাধ্যমে এই অসম্ভবকেও সম্ভব করা সম্ভব।
দক্ষিণ কোরিয়ার এই অগ্রযাত্রার পেছনের মূল রহস্য লুকিয়ে রয়েছে দেশটির দীর্ঘমেয়াদি ও জনমুখী নীতিমালার মধ্যে। আশির দশকের শেষভাগ থেকে দেশটি সর্বজনীন জাতীয় স্বাস্থ্যবিমা ব্যবস্থার প্রচলন করে, যার সুফল কেবল শহরাঞ্চল বা বিত্তবানদের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে সমাজের প্রতিটি স্তরে পৌঁছে যায়। এছাড়া উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ, কার্ডিওভাসকুলার রোগ প্রতিরোধে কার্যকরী পদক্ষেপ, শৈশবে উন্নত পুষ্টি নিশ্চিতকরণ এবং নারীদের মধ্যে ধূমপানের অত্যন্ত কম হার তাদের গড় আয়ু বৃদ্ধিতে সরাসরি ভূমিকা রেখেছে। গবেষকদের মতে, দক্ষিণ কোরিয়ার সাফল্যের মূল চাবিকাঠি ছিল আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জামের প্রাচুর্য নয়, বরং সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবার সুষম বণ্টন এবং মানসম্মত জীবনযাত্রার নিশ্চয়তা।
তবে এই অভাবনীয় সাফল্যের পাশাপাশি দক্ষিণ কোরিয়া বর্তমানে একটি অত্যন্ত জটিল জনমিতিক সংকটের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে। একদিকে দেশটির নারীরা বিশ্বের দীর্ঘতম জীবনের অধিকারী হতে চলেছেন, অন্যদিকে সেখানে জন্মহার এখন বিশ্বজুড়ে সর্বনিম্নগুলোর একটি। প্রজনন হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ায় সমাজে নতুন প্রজন্মের সংখ্যা দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে, যা ভবিষ্যতে দেশের শ্রমবাজার, পেনশন স্কিম, এবং প্রবীণ জনগোষ্ঠীর সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থার ওপর বিশাল চাপ সৃষ্টি করতে পারে। ইতোমধ্যে দেশটির নারীদের গড় আয়ু ৮৬ থেকে ৮৭ বছরের কোঠা অতিক্রম করেছে এবং সাম্প্রতিক বৈশ্বিক মহামারি কোভিড-১৯ এর প্রতিবন্ধকতা কাটিয়ে তারা আবারও ঊর্ধ্বমুখী ধারায় ফিরেছে। ২০৩০ সালের মধ্যে কাঙ্ক্ষিত ৯০ বছরের লক্ষ্যমাত্রায় পৌঁছাতে হলে এই গতিশীলতা বজায় রাখা এবং নতুন জনমিতিক চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করা অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, দক্ষিণ কোরিয়ার এই সম্ভাব্য অর্জন কেবল চিকিৎসা বিজ্ঞানের একক বিজয় নয়; এটি একটি সফল রাষ্ট্রীয় মডেলের প্রতিচ্ছবি। এটি প্রমাণ করে যে, নাগরিকদের জীবনকাল দীর্ঘায়িত করতে কেবল উন্নত হাসপাতাল যথেষ্ট নয়, বরং এর জন্য প্রয়োজন சமতাভিত্তিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা, নিরাপদ খাদ্য, মানসম্মত শিক্ষা এবং সুদূরপ্রসারী সামাজিক নীতি। ২০৩০ সালে দক্ষিণ কোরিয়ার নারীরা বিশ্বমঞ্চে এই নতুন রেকর্ড গড়তে পারবেন কি না, তা সময়ই নির্ধারণ করবে। তবে তারা ইতোমধ্যে সমগ্র বিশ্বকে এই বার্তাটি দিয়েছেন যে, সুস্থ ও দীর্ঘ জীবনের ভিত রচিত হয় প্রতিদিনের সচেতন জীবনযাপন, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং সবার জন্য নিশ্চিত করা মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবার সুদৃঢ় কাঠামোর ওপর।

