শারীরিক সীমাবদ্ধতা মানুষকে থমকে দেয়—এমন প্রচলিত ধারণাকে ভুল প্রমাণ করে এক অনন্য মানবিক নজির স্থাপন করেছেন চাঁপাইনবাবগঞ্জের দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মুকলেস আলী। চোখের আলো না থাকলেও অন্তরের অদম্য ইচ্ছাশক্তি ও আত্মমর্যাদাবোধকে পাথেয় করে বিগত ২৬ বছর ধরে কঠোর শারীরিক পরিশ্রম করে যাচ্ছেন তিনি। কাঠ চেরাইয়ের মতো অত্যন্ত বিপজ্জনক ও কঠিন কাজ করে জীবিকা নির্বাহের পাশাপাশি পরম মমতায় আগলে রেখেছেন নিজের বয়োবৃদ্ধ মাকে। দারিদ্র্য ও প্রতিবন্ধিতাকে জয় করে মায়ের প্রতি সন্তানের এই অপরিসীম দায়িত্ববোধ স্থানীয় বাসিন্দা ও সচেতন মহলকে গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করেছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, চাঁপাইনবাবগঞ্জের বাসিন্দা মুকলেস আলী চোখের দৃষ্টিহীনতা সত্ত্বেও কখনো ভিক্ষাবৃত্তি বা পরনির্ভরশীলতার পথ বেছে নেননি। জীবনের কঠিন বাস্তবতায় নিজেকে স্বাবলম্বী করার কঠোর সংকল্প নিয়ে তিনি পা বাড়ান কাঠ চেরাইয়ের শ্রমিক হিসেবে। যেখানে পূর্ণ দৃষ্টিশক্তিসম্পন্ন মানুষের জন্য ধারালো করাত, কুড়াল ও ভারী কাঠের গুঁড়ি নিয়ে কাজ করা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ, সেখানে মুকলেস কেবল স্পর্শ, অনুভূতি ও দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতার ওপর নির্ভর করে নিখুঁতভাবে কাঠ চেরাই করে যাচ্ছেন। সহকর্মী এবং করাতকল মালিকদের কাছে তার এই দক্ষতা ও কাজের প্রতি নিষ্ঠা বিস্ময়ের সৃষ্টি করে।
বিগত আড়াই দশকেরও বেশি সময় ধরে প্রতিদিন ভোরে কাজের উদ্দেশ্যে ঘর থেকে বের হন মুকলেস। দিনভর হাড়ভাঙা খাটুনির পর অর্জিত অর্থ দিয়ে তিনি মিটিয়ে থাকেন সংসারের যাবতীয় চাহিদা। মায়ের প্রতিদিনের খাবার, চিকিৎসা ও ওষুধের খরচ জোগাতে কখনো পিছিয়ে যাননি এই সংগ্রামী সন্তান। মুকলেসের মায়ের মতে, শারীরিক অক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও ছেলে তার জীবনের সবচেয়ে বড় আশ্রয় ও শক্তি। পরম স্নেহে মুকলেস যেভাবে অভাব-অনটনের মাঝেও তাকে লালন-পালন করছেন, তা যেকোনো সন্তানের জন্যই এক অনন্য অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত।
মুকলেস আলীর এই জীবনসংগ্রাম কেবল একটি পরিবরের গল্পেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং তা সমাজের এক বিরাট শিক্ষার আলোকবর্তিকা হয়ে উঠেছে। আধুনিক সমাজে যেখানে অনেক ক্ষেত্রে পিতা-মাতার পরিচর্যায় অবহেলা দেখা যায়, সেখানে মুকলেসের এই নিবেদিতপ্রাণ মাতৃভক্তি সমাজের চিন্তা জগতকে নতুন করে ভাবিয়ে তোলে। এলাকার মানুষ তাকে অত্যন্ত শ্রদ্ধা ও স্নেহের চোখে দেখেন। স্থানীয়রা জানান, মুকলেসের অদম্য আত্মসম্মানবোধ তাকে কারও কাছে হাত পাততে দেয়নি, বরং নিজের ঘামে উপার্জিত অর্থেই তিনি নিজের ও মায়ের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করেছেন।
তবে দীর্ঘ ২৬ বছরের নিরবচ্ছিন্ন হাড়ভাঙা শারীরিক পরিশ্রমের ফলে মুকলেসের শরীরেও এখন বয়সের ছাপ ও ক্লান্তি স্পষ্ট হয়ে উঠছে। বয়স বাড়ার সাথে সাথে কাঠ চেরাইয়ের মতো ভারী ও ঝুঁকিপূর্ণ কাজ চালিয়ে যাওয়া তার জন্য দিন দিন আরও কঠিন হয়ে পড়ছে। এই অবস্থায় স্থানীয় সুশীল সমাজ ও সচেতন নাগরিকদের দাবি, সরকারি সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী কর্মসূচির আওতায় মুকলেস আলীকে উপযুক্ত সহযোগিতা প্রদান করা উচিত। একই সাথে সরকারি বা বেসরকারি অনুদানের মাধ্যমে তার পরিবারের জন্য স্থায়ী পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হলে এই সংগ্রামী মানুষটি জীবনের শেষভাগে এসে কিছুটা হলেও স্বস্তি ও নিরাপদে দিন কাটাতে পারবেন। মুকলেস আলীর এই সংগ্রাম আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, ইচ্ছাশক্তি ও মানবিক মূল্যবোধের সামনে যেকোনো দৈহিক প্রতিবন্ধকতাই পরাজিত হতে বাধ্য।

