পাবনার প্রায় ২০০ বছরের ঐতিহ্যবাহী হোসিয়ারিশিল্প বর্তমানে এক নজিরবিহীন সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ভারত অভিমুখে স্থলপথে পণ্য রপ্তানি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় জেলাটির হাজার হাজার কারখানা স্থবির হয়ে পড়েছে। পাবনা জেলা হোসিয়ারি ম্যানুফ্যাকচারার্স গ্রুপের তথ্য অনুযায়ী, জেলায় ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় তিন হাজার কারখানা রয়েছে। এক সময় এসব কারখানায় লক্ষাধিক শ্রমিকের কর্মসংস্থান থাকলেও বর্তমানে প্রায় ৬৫ শতাংশ শ্রমিকই কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। শিল্পটির এই করুণ দশায় একদিকে যেমন মালিকরা দেউলিয়া হওয়ার পথে, অন্যদিকে শ্রমিকরা তাদের পরিবার-পরিজন নিয়ে অমানবিক জীবনযাপন করছেন।
পাবনা শহরের সাধুপাড়া, দ্বীপচর, বাংলাবাজার ও দিলালপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, অধিকাংশ কারখানার শোরুমে উৎপাদিত পোশাক স্তূপ করে পড়ে আছে। আগে যেখানে কাজের চাপে দম ফেলার সময় পাওয়া যেত না, সেখানে এখন নিস্তব্ধতা বিরাজ করছে। ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, স্থলপথে রপ্তানি সুবিধা বন্ধ হওয়ায় এখন নৌপথে বা চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহার করে পণ্য পাঠাতে হচ্ছে। এতে পরিবহন ব্যয় বহুগুণ বেড়ে গেছে এবং সময় লাগছে দ্বিগুণের বেশি। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা হারিয়ে ফেলছেন স্থানীয় উদ্যোক্তারা।
ঐতিহাসিকভাবে পাবনার হোসিয়ারিশিল্পের সুনাম দেশ ছাড়িয়ে বিদেশেও বিস্তৃত ছিল। ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর থেকে বিভিন্ন চড়াই-উতরাই পার করে ১৯৯০-এর দশকে এই শিল্প নতুন রূপ পায়। ঝুট কাপড় থেকে গেঞ্জি, শার্ট, সোয়েটারসহ নিত্যনতুন পণ্য উৎপাদনের মাধ্যমে এটি পাবনার অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তিতে পরিণত হয়েছিল। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতির কারণে ব্যবসায়ীরা তাদের ব্যাংকের ঋণ পরিশোধ করতে পারছেন না। অনেক উদ্যোক্তা এনজিও বা ব্যক্তিগত ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে কারখানা বন্ধ করে দিতে বাধ্য হচ্ছেন।
শিল্প সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এই সংকট দীর্ঘায়িত হলে পাবনার ঐতিহ্যবাহী এই শিল্প চিরতরে বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারে। জেলা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের পক্ষ থেকে সরকারের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করা হয়েছে। ব্যবসায়ীদের দাবি, অতিদ্রুত স্থলপথে রপ্তানি ব্যবস্থা পুনর্বহাল করা না হলে হাজার হাজার পরিবারের আয়ের পথ বন্ধ হয়ে যাবে। বর্তমানে দেশের অর্থনীতিতে এই খাতের অবদান ধরে রাখতে হলে এবং দক্ষ শ্রমিকদের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে দ্রুত নীতিগত ও কূটনৈতিক পদক্ষেপ নেওয়া এখন সময়ের দাবি।

