মধ্যপ্রাচ্যের কৌশলগত সামরিক পরিস্থিতিতে নতুন করে উত্তাপ ছড়িয়ে টানা ১১তম দিনের মতো ইরানে বিমান হামলা ও সামরিক অভিযান পরিচালনা করেছে যুক্তরাষ্ট্র। আন্তর্জাতিক জ্বালানি পরিবহনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পথ হরমুজ প্রণালীকে কেন্দ্র করে দুই দেশের মধ্যে মুখোমুখি অবস্থান যখন চরম আকার ধারণ করেছে, ঠিক তখনই এই ধারাবাহিক বিমান হামলার ঘটনা ঘটলো। ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার এই সরাসরি সামরিক সংঘাত পুরো অঞ্চলজুড়ে একটি সর্বাত্মক যুদ্ধের আশঙ্কা তৈরি করেছে।
উদ্ভূত পরিস্থিতির তীব্রতা বৃদ্ধিতে মার্কিন প্রশাসনের অবস্থান আরও স্পষ্ট ও কঠোর করেছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এক চরম সতর্কবার্তা উচ্চারণ করে ট্রাম্প জানান, এই সংঘাতের প্রক্রিয়ায় যদি কোনো মার্কিন সামরিক সদস্য বা সেনা নিহত হয়, তবে ইরানকে তার ‘বহুগুণ’ ভারী মূল্য দিতে হবে। পেন্টাগন সূত্রে জানা গেছে, ইরানকে কৌশলগতভাবে কোণঠাসা করতে এবং তাদের আঞ্চলিক প্রভাব খর্ব করতে ওয়াশিংটন এক নতুন সামরিক ও কূটনৈতিক কৌশল গ্রহণ করেছে। মূলত হরমুজ প্রণালীতে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করা এবং মধ্যপ্রাচ্যে ইরানি মদদপুষ্ট গোষ্ঠীগুলোর সামরিক সক্ষমতা ধূলিসাৎ করাই যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান লক্ষ্য।
অন্যদিকে, মার্কিন সরকারের অব্যাহত হামলা ও হুমকি সত্ত্বেও অনমনীয় মনোভাব প্রদর্শন করছে তেহরান। ওয়াশিংটনের হুংকারের জবাবে পাল্টা তোপ দেগেছে ইরানি সামরিক ও রাজনৈতিক নেতৃত্ব। দেশটির বিপ্লবী গার্ড ও শীর্ষ কর্মকর্তারা এক যৌথ বিবৃতিতে স্পষ্ট করে জানিয়েছে যে, ‘অত্যাচারীদের উপযুক্ত শাস্তি দেওয়ার অভিযান’ কোনো অবস্থাতেই স্থগিত করা হবে না। তেহরান আরও হুঁশিয়ারি দিয়েছে যে, যুক্তরাষ্ট্রের যেকোনো ধরনের ভুল পদক্ষেপের ভয়াবহ পরিণাম ভোগ করতে হবে এবং মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত সমস্ত মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ও তাদের আঞ্চলিক সহযোগীরা ইরানের রকেটের নিখুঁত নিশানা থেকে মুক্ত থাকবে না।
বিশ্বের মোট জ্বালানি তেল সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ সম্পন্ন হয় কৌশলগতভাবে সংবেদনশীল হরমুজ প্রণালী দিয়ে। বর্তমানে এই প্রণালীকে ঘিরে দুপক্ষের রণসজ্জা এবং সামরিক মহড়ার ফলে সমুদ্রপথে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়েছে। ইতোমধ্যেই আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম এক লাফেই অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে, যা বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি ও অর্থনৈতিক মন্দাকে নতুন করে উসকে দিচ্ছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও বিভিন্ন পরাশক্তি উভয় পক্ষকে সর্বোচ্চ সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানালেও যুদ্ধক্ষেত্রের বর্তমান পরিস্থিতি ভিন্ন বার্তা দিচ্ছে।
কূটনৈতিক মহলের মতে, সামরিক পদক্ষেপ বাড়ার কারণে দুপক্ষের মধ্যে মধ্যস্থতা ও সংকট সমাধানের পথ ক্রমান্বয়ে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ও বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা এই সংকট নিরসনে অবিলম্বে কার্যকর যুদ্ধবিরতি ঘোষণা এবং দ্বিপাক্ষিক আলোচনা শুরুর জোর তাগিদ দিচ্ছে। তবে মার্কিন প্রশাসনের কঠোর দৃষ্টিভঙ্গি এবং তেহরানের পাল্টা প্রতিরক্ষার সংকল্প বজায় থাকলে নিকট ভবিষ্যতে মধ্যপ্রাচ্যের এই সংকট প্রশমিত হওয়ার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।

