বিশ্বকাপ ফুটবল কেবল ৯০ মিনিটের মাঠের লড়াই নাকি বিশ্বরাজনীতি ও ভূরাজনৈতিক ক্ষমতার এক জটিল মঞ্চ—এই প্রশ্নটি আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনে ফের নতুন করে আলোচনায় এসেছে। ২০২৬ সালের ফুটবল মহাযজ্ঞের পর্দা নামার পর ক্রীড়া ইতিহাসবিদ ও গবেষকরা বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন, গত এক শতাব্দী ধরে আন্তর্জাতিক ফুটবলের বড় বড় আসরগুলোকে কেবল নিছক খেলার ফ্রেমে আটকে রাখা সম্ভব হয়নি। সবুজ মাঠের এই উন্মাদনার আড়ালে বহুবার জড়িয়ে থেকেছে স্বৈরশাসন, বৈশ্বিক কূটনীতি, অর্থনৈতিক স্বার্থ ও জাতীয়তাবাদী রাজনীতির জটিল হিসাব-নিকাশ।
বিশ্বকাপের সূচনালগ্নে অর্থাৎ ১৯২০-এর দশকে অলিম্পিকের বাইরে আন্তর্জাতিক ফুটবলের একটি স্বতন্ত্র মঞ্চ তৈরির উদ্যোগ নেন ফিফার তৎকালীন সভাপতি জুলে রিমে। তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি ছিল ফুটবলের মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে ঐক্যের বার্তা ছড়ানো। ১৯৩০ সালে উরুগুয়েতে প্রথম বিশ্বকাপ আয়োজনের মধ্য দিয়ে সেই স্বপ্নের যাত্রা শুরু হলেও প্রথম আসরের ফাইনাল থেকেই মাঠের বাইরের রাজনীতি ও প্রশাসনিক টানাপোড়েন স্পষ্ট হয়ে ওঠে। আর্জেন্টিনা ও স্বাগতিক উরুগুয়ের মধ্যকার ফাইনালে ব্যবহৃত ম্যাচ বল নিয়ে দ্বন্দ্ব এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে, অবশেষে দুই অর্ধে দুটি ভিন্ন দেশের আনা বল ব্যবহার করতে বাধ্য হয় আয়োজকরা।
তবে খেলার মাঠের এই প্রশাসনিক বল-বিতর্কের চেয়েও দ্রুত বড় হয়ে ওঠে বিশ্বশাসকদের রাজনৈতিক স্বার্থে ফুটবলকে ব্যবহারের প্রবণতা। ১৯৩০-এর দশকেই ইতালির ফ্যাসিবাদী শাসক বেনিতো মুসোলিনি ফুটবলকে নিজের রাজনৈতিক প্রচারণার প্রধান হাতিয়ার হিসেবে গ্রহণ করেন। ১৯৩৪ ও ১৯৩৮ সালের বিশ্বকাপে মুসোলিনির প্রত্যক্ষ প্রভাব ও দলীয় হস্তক্ষেপের নানা নজির ইতিহাসবিদ সাইমন মার্টিন ও ডেনিস ম্যাক স্মিথের গবেষণায় উঠে এসেছে। ১৯৩৪ আসরে বিশাল সরকারি বাজেট বরাদ্দের পাশাপাশি সুইডিশ রেফারি ইভান একলিন্ডের বিতর্কিত ম্যাচ পরিচালনা ইতালিকে শিরোপা জিততে সাহায্য করেছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। পরবর্তীতে ১৯৩৮ আসরেও ইতালীয় খেলোয়াড়দের ওপর জয় ছিনিয়ে আনার জন্য প্রবল রাষ্ট্রীয় চাপ ছিল। ইতিহাসবিদদের মতে, সে সময় পরপর দুটি বিশ্বকাপ জয়কে ফ্যাসিবাদী শাসনব্যবস্থার সফলতার দলিল হিসেবে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে তুলে ধরেছিলেন মুসোলিনি।
ফুটবল ও রাজনীতির এই কুৎসিত রূপ আরও ভয়াবহভাবে উন্মোচিত হয়েছিল ১৯৭৮ সালের আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপে। জেনারেল হোর্হে রাফায়েল ভিদেলার নেতৃত্বাধীন সামরিক জান্তা সরকারের আমলে আর্জেন্টিনার অভ্যন্তরে হাজার হাজার রাজনৈতিক কর্মীকে গুম, নির্যাতন ও হত্যা করা হচ্ছিল। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর প্রতিবেদন এবং সরকারি তদন্ত নথি অনুযায়ী, সে সময় দেশের ভেতরের নৃশংস ‘ডার্টি ওয়ার’ আড়াল করে আর্জেন্টিনার একটি সুশৃঙ্খল ও স্থিতিশীল ভাবমূর্তি বিশ্বমঞ্চে উপস্থাপনের বড় প্রকল্প হিসেবে গ্রহণ করা হয় বিশ্বকাপকে। বুয়েনস এইরেসের যে স্টেডিয়ামে দর্শকেরা দলের জয়ে উল্লাস করছিল, তার কয়েকশত মিটার দূরে নৌবাহিনীর গোপন কেন্দ্রে বন্দী মানবাধিকার কর্মীদের ওপর অমানুষিক নির্যাতন চালানো হচ্ছিল। এছাড়া ফাইনালে ওঠার সমীকরণে পেরুর বিরুদ্ধে আর্জেন্টিনার ৬-০ গোলের জয়টিকে আজও ক্রীড়া ইতিহাসের অন্যতম রহস্যময় ও সন্দেহজনক ম্যাচ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও ক্রীড়া ইতিহাসবিদদের মতে, ফুটবল কখনোই বৈশ্বিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট থেকে বিচ্ছিন্ন কোনো দ্বীপ নয়। ১৯৮২ সালের ফকল্যান্ড যুদ্ধের রেশ ধরে ১৯৮৬ বিশ্বকাপে মারাদোনার সেই বহুল আলোচিত ‘হ্যান্ড অব গড’ ম্যাচ কিংবা বিভিন্ন সময়ে সামরিক উত্তেজনার মাঝে বিশ্বকাপের আয়োজন—সবই প্রমাণ করে যে ফুটবল ও রাজনীতির সীমান্তরেখা অনেক আগেই মুছে গেছে। ১৯৩০ সালে উরুগুয়ে থেকে শুরু করে ২০২৬ সাল পর্যন্ত বিস্তৃত এই ১০০ বছরের যাত্রায় ফুটবল একদিকে যেমন কোটি কোটি মানুষের আনন্দ ও রোমাঞ্চের প্রতীক হয়ে থেকেছে, অন্যদিকে বৈশ্বিক ক্ষমতা প্রদর্শন ও রাজনৈতিক বৈধতা অর্জনের একটি সূক্ষ্ম মাধ্যম হিসেবেও ব্যবহৃত হয়ে এসেছে।

