দেশের স্থানীয় সরকার নির্বাচন ব্যবস্থাকে আরও স্বচ্ছ, অংশগ্রহণমূলক এবং বিতর্কমুক্ত করার লক্ষ্যে ব্যাপক সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত এক উচ্চপর্যায়ের সভায় ইসি ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা, উপজেলা ও সিটি করপোরেশন নির্বাচনের বিদ্যমান আইন সংশোধনের জন্য একগুচ্ছ যুগান্তকারী প্রস্তাব চূড়ান্ত করেছে। এই প্রস্তাবগুলোর মূল লক্ষ্য হলো নির্বাচন প্রক্রিয়াকে অধিকতর সংহত করা এবং নির্বাচনী প্রার্থীদের যোগ্যতা ও স্বচ্ছতার মানদণ্ড নতুন করে নির্ধারণ করা।
প্রস্তাবিত সংশোধনীগুলোর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হলো এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার সুযোগ সীমিত করা। বর্তমান আইন অনুযায়ী, এমপিওভুক্ত শিক্ষক ও কর্মকর্তারা স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারেন। তবে কমিশন মনে করে, এ ধরনের শিক্ষকরা প্রত্যক্ষ রাজনীতিতে যুক্ত থাকলে শিক্ষার গুণগত পরিবেশ ও প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই তাদের নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণা করার বিষয়ে কমিশন নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
পাশাপাশি, দ্বৈত নাগরিকত্বের বিষয়েও কঠোর অবস্থানে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছে ইসি। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দ্বৈত নাগরিকদের অংশ নেওয়ার ক্ষেত্রে বর্তমানে বাধা থাকলেও স্থানীয় নির্বাচনে এতদিন এ ধরনের কড়াকড়ি ছিল না। নতুন প্রস্তাব অনুযায়ী, ইউপি সদস্য পদ ছাড়া স্থানীয় সরকারের অন্যান্য স্তরে দ্বৈত নাগরিকদের প্রার্থী হওয়া নিষিদ্ধ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে, যারা আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের (আইসিটি) চার্জশিটভুক্ত আসামি, তাদেরও নির্বাচনে অংশ নিতে অযোগ্য ঘোষণা করার সুপারিশ করা হয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নের অংশ হিসেবে ইসি এখন স্থানীয় সরকারের সব ধরনের নির্বাচনে সেনা মোতায়েনের আইনি সুযোগ রাখতে চায়। ইসি সচিব আখতার আহমেদ জানিয়েছেন, বিদ্যমান আইনে ‘আইন প্রয়োগকারী সংস্থা’র সংজ্ঞায় সশস্ত্র বাহিনীকে অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এটি কার্যকর হলে নির্বাচনী দায়িত্বে সশস্ত্র বাহিনী মোতায়েনের জন্য আলাদা কোনো বিশেষ আদেশের প্রয়োজন পড়বে না, যা পুলিশের মতোই তাদের ভোটকেন্দ্রে দায়িত্ব পালন এবং গ্রেপ্তারি ক্ষমতা প্রদানে সহায়তা করবে।
আর্থিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে ইসি ঋণখেলাপিদের সংজ্ঞার পরিধি বাড়াতে চায়। কেবল মূল ঋণগ্রহীতা নয়, ঋণের জামিনদারদেরও খেলাপির দায়ে অভিযুক্ত করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। এছাড়া বিদ্যুৎ বিল, ভূমি কর কিংবা ওয়াসা বিলের মতো সেবা খাতের পাওনা বকেয়া থাকলে সংশ্লিষ্ট প্রার্থীকে অযোগ্য বিবেচনা করা হবে। এমনকি সিটি করপোরেশনের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্বপালনকারী ব্যক্তিরা নির্বাচনে প্রার্থী হতে চাইলে আগে পদত্যাগ করতে হবে।
এনআইডি বা জাতীয় পরিচয়পত্র সংক্রান্ত বিষয়ে ইসি ডিজিটাল পদ্ধতি আরও সহজতর করার উদ্যোগ নিয়েছে। ভোটার এলাকা স্থানান্তর এখন থেকে অনলাইনে সম্পন্ন করা যাবে এবং এর জন্য নির্দিষ্ট ফি নির্ধারণ করা হবে। এছাড়াও এনআইডি নবায়ন প্রক্রিয়াকে আরও সুশৃঙ্খল করতে পারিবারিক তথ্যের ভিত্তিতে ‘ফ্যামিলি ট্রি’ বা পারিবারিক বৃক্ষ পদ্ধতির প্রবর্তন করা হবে। ১৬ বছর বয়সীদের তথ্য সংগ্রহের বিদ্যমান প্রক্রিয়াকে আরও নিচের ক্লাসে (যেমন অষ্টম বা প্রাথমিক স্তর) নামিয়ে আনার সম্ভাবনা নিয়েও পর্যালোচনা চলছে। তবে এই চূড়ান্ত প্রস্তাবগুলো সরকার আমলে নেয় কিনা এবং পরবর্তীতে সংসদে আইন পাস হয় কিনা—তা এখন দেখার বিষয়।

