কিশোরগঞ্জের ভৈরব উপজেলার কালিকাপ্রসাদ ইউনিয়নে একটি সরকারি সাইনবোর্ডকে কেন্দ্র করে দুটি প্রতিবেশী গ্রামের অধিবাসীদের দীর্ঘদিনের বিরোধ শেষ পর্যন্ত ভয়াবহ রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে রূপ নিয়েছে। উপজেলার আকবরনগর ও মিরারচর গ্রামের বাসিন্দাদের মধ্যে সাম্প্রতিক এই সংঘাতের ঘটনায় অন্তত ২ জন প্রাণ হারিয়েছেন এবং ২৫ জন মারাত্মকভাবে আহত হয়েছেন। আপাতদৃষ্টিতে সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের টাঙানো একটি সাইনবোর্ডের নামকরণের বিতর্ক থেকে এই সহিংসতার সূত্রপাত হলেও, স্থানীয় বিশ্লেষকদের মতে এটি মূলত সামাজিক সম্পর্কের অবক্ষয় এবং এলাকাভিত্তিক আধিপত্য বিস্তারের এক বিপজ্জনক মহড়ার বহিঃপ্রকাশ।
সংঘাতের মূলে রয়েছে সড়ক ও জনপথ বিভাগের স্থাপন করা একটি সবুজ পটভূমির সাইনবোর্ড, যেখানে সাদা অক্ষরে লেখা ছিল ‘আকবরনগর বাজার’। স্থানীয় সূত্র ও অধিবাসীদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, মিরারচর গ্রামের বাসিন্দাদের দীর্ঘদিনের দাবি, ঐতিহাসিক পটভূমি, যৌথ সামাজিক উদ্যোগ ও বাজারে তাঁদের সমান অংশগ্রহণের স্বীকৃতি হিসেবে সাইনবোর্ডে তাঁদের গ্রামের নামও অন্তর্ভুক্ত করা উচিত। অন্যদিকে, আকবরনগর গ্রামের বাসিন্দাদের যুক্তি হলো—ভৌগোলিক সীমানা, মৌজা নিবন্ধন এবং অবকাঠামোগত দিক দিয়ে বাজারটি সম্পূর্ণভাবে তাঁদের সীমানার মধ্যে অবস্থিত, তাই সাইনবোর্ডে কেবল আকবরনগরের নাম থাকাটিই আইনসম্মত ও যুক্তিসংগত।
ভৌগোলিক বাস্তবতা ও সামাজিক অংশীদারিত্বের এই দ্বিমাত্রিক অবস্থান আলোচনার টেবিলে সমাধানের পরিবর্তে দুই পক্ষের মধ্যে এক চরম মনস্তাত্ত্বিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও সংকীর্ণ শ্রেষ্ঠত্ববোধের জন্ম দেয়। ধীরে ধীরে ‘আমার গ্রাম’ বনাম ‘তোমার গ্রাম’—এই বৈরী মনোভাব স্থানীয় সম্প্রীতিকে ধূলিসাৎ করে দেয়। কয়েক বছর ধরে চলতে থাকা এই উত্তেজনা একাধিকবার ছোটখাটো ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ায় গড়ালেও, সর্বশেষ সোমবারের সংঘাত তা সব সীমা অতিক্রম করে। সংঘর্ষ চলাকালে উভয় পক্ষের মধ্যে ব্যাপক ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। সহিংসতার তীব্রতার কারণে ভৈরব-ময়মনসিংহ রেলপথ ধরে ট্রেন চলাচল প্রায় কয়েক ঘণ্টা সম্পূর্ণ বন্ধ রাখতে হয়, যা সাধারণ ট্রেনযাত্রীদের চরম ভোগান্তিতে ফেলে।
এই হৃদয়বিদারক ঘটনায় মিরারচর গ্রামের দুই অধিবাসী প্রাণ হারানোর পাশাপাশি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন অন্তত ২৫ জন। একটি সাধারণ সাইনবোর্ড এখানে সহিংসতার মূল কারণ নয়, বরং বাহ্যিক একটি অজুহাত মাত্র। প্রকৃত সংকট সুদীর্ঘদিনের পারস্পরিক অবিশ্বাসের গভীরে প্রোথিত। নিজেদের গ্রামের নাম প্রতিষ্ঠা করার মধ্য দিয়ে এলাকায় একধরনের ‘প্রতীকী আধিপত্য’ কায়েম করার এই প্রতিযোগিতায় উভয় পক্ষই সামাজিক সম্ভাবনা ও সুপ্রতিবেশীর সম্পর্কের মতো মৌলিক মূল্যবোধকে বিসর্জন দিয়েছে।
তবে উদ্ভূত এই সংকটের জন্য কেবল স্থানীয় বাসিন্দাদের পারস্পরিক মনস্তত্ত্বকে দায়ী করে পার পাওয়ার সুযোগ নেই। এর পেছনে সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তর ও স্থানীয় প্রশাসনের চরম অবহেলা ও দীর্ঘসূত্রতাকে অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে। সড়ক ও জনপথ বিভাগ যখন প্রথম সাইনবোর্ডটি স্থাপন করে এবং তখনই যখন ক্ষোভের সৃষ্টি হয়, তখন সময়মতো প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। প্রাথমিক বিরোধ দেখা দেওয়ার পরপরই যদি প্রশাসন উদ্যোগী হয়ে উভয় পক্ষকে নিয়ে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক আলোচনায় বসত এবং যৌথ নামকরণ কিংবা কোনো নিরপেক্ষ নাম চয়ন করে বিবাদ মীমাংসার ব্যবস্থা করত, তবে আজকের এই জোড়া হত্যা ও জানমালের ব্যাপক ক্ষতি এড়ানো সম্ভব হতো।
এখন প্রতীকী ক্ষমতার লড়াই পরিহার করে বাস্তবসম্মত ও স্থায়ী শান্তির পথে হাঁটাই একমাত্র সমাধান। স্থানীয় প্রশাসনকে অতি দ্রুত উদ্যোগী হয়ে দুই গ্রামের বয়োজ্যেষ্ঠ, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি মধ্যস্থতা বৈঠক আহ্বান করতে হবে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে সহিংসতায় জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি একটি সর্বজনগ্রাহ্য সমাধান নিশ্চিত করতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি না ঘটে।

