রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (রাকসু) সাধারণ সম্পাদক (জিএস) সালাউদ্দিন আম্মারসহ কয়েকজন ছাত্রনেতার বিরুদ্ধে ক্যাম্পাসে একের পর এক মব জাস্টিস, অপশাসন, শিক্ষার্থীদের মারধর এবং প্রশাসনিক কাজে বেআইনি হস্তক্ষেপের অভিযোগ উঠেছে। গঠনতন্ত্র অনুযায়ী শিক্ষার্থীদের অধিকার রক্ষা, সাংস্কৃতিক বিকাশ ও মানবিক গুণাবলী নিশ্চিত করার দায়িত্ব থাকলেও, সাম্প্রতিক সময়ে তাঁদের নানা বিতর্কিত কর্মকাণ্ড ক্যাম্পাসের সার্বিক শিক্ষার পরিবেশকে গুরুতর ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছে বলে মনে করছেন শিক্ষক ও সাধারণ শিক্ষার্থীরা।
সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর কার্যালয়ে একটি ব্যক্তিগত বিষয়ের আপস-মীমাংসা চলাকালে বাগ্বিতণ্ডা এবং পরবর্তী সময়ে কেন্দ্রীয় পাঠাগারে ঢুকে শিক্ষার্থীকে পিটিয়ে আহত করার ঘটনা নতুন করে চরম আলোচনার জন্ম দিয়েছে। প্রত্যক্ষদর্শী ও গণমাধ্যমের সূত্রমতে, প্রক্টর অফিসে এক শিক্ষার্থীর পক্ষ নিয়ে কথা বলতে আসা তরুণদের নিষিদ্ধ ঘোষিত ‘ছাত্রলীগ’ ট্যাগ দিয়ে তাদের মুঠোফোন বেআইনিভাবে তল্লাশি করা হয়। পরবর্তীতে রাকসু জিএস সালাউদ্দিন আম্মার ও তাঁর সমর্থকেরা গ্রন্থাগারের পাঠাগারে ঢুকে তাণ্ডব চালান। শুধু তা-ই নয়, মারধরে আহত শিক্ষার্থীদের চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার উদ্দেশ্যে অ্যাম্বুলেন্সে তোলা হলে সেখান থেকেও টেনেহিঁচড়ে নামিয়ে পুনরায় পিটিয়ে জখম করা হয়। প্রক্টরিয়াল বডি ও পুলিশ প্রশাসনের উপস্থিতিতে ঘটে যাওয়া এই সহিংসতার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়।
বিশ্ববিদ্যালয় সংশ্লিষ্টদের মতে, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। বিগত বছর জুড়ে রাকসুর এই নেতৃত্বের বিরুদ্ধে একের পর এক ক্ষমতার অপব্যবহার ও আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার নজির দেখা গেছে। ইতিপূর্বে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রারকে প্রশাসনিক দপ্তরে হুমকি প্রদান, উপাচার্য ও সহ-উপাচার্যের দপ্তরসহ পুরো প্রশাসনিক ভবনে তালা ঝুলিয়ে বিভিন্ন অনুষদের শিক্ষকদের জোরপূর্বক পদত্যাগে বাধ্য করা এবং রাজনৈতিক নেতাদের টানানো ব্যানার ছিঁড়ে ফেলার মতো উসকানিমূলক কর্মকাণ্ডে তাঁরা যুক্ত ছিলেন। সহশিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা, ক্যারিয়ার সেমিনার ও বিতর্ক প্রতিযোগিতার আয়োজন ছেড়ে এসব এখতিয়ারবহির্ভূত বলপ্রয়োগের সংস্কৃতি সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে দিয়েছে।
উল্লেখ্য, রাকসুর গঠনতন্ত্রে স্পষ্ট বলা রয়েছে—শিক্ষার্থীদের মধ্যে পারস্পরিক সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপন, সৃজনশীলতার বিকাশ এবং দেশ-বিদেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সহযোগিতামূলক পরিবেশ গড়ে তোলাই ছাত্রসংসদের মূল লক্ষ্য। তবে ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে নির্বাচিত হয়েও এই প্রতিনিধিরা নিজেদের মূল দায়িত্ব ভুলে গিয়ে বিচারকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন। তৎকালীন সময়ে আইনশৃঙ্খলার নামে পুলিশের সাধারণ শিক্ষার্থীদের মোবাইল তল্লাশির প্রতিবাদ জানানো নেতারা এখন নিজেরাই শিক্ষার্থীদের মোবাইল কেড়ে নিয়ে ‘ট্যাগিং’ রাজনীতি শুরু করেছেন, যা মৌলিক মানবাধিকার ও ছাত্র রাজনীতির মূল চেতনার পরিপন্থী।
শিক্ষাবিদ ও বিশ্লেষকদের মতে, অপরাধে জড়িত যে কারোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার একচ্ছত্র এখতিয়ার কেবল বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও দেশের প্রচলিত বিচার ব্যবস্থার। ছাত্রসংসদের ব্যানারে মাস্তানি ও মব জাস্টিস অব্যাহত থাকলে তা উচ্চশিক্ষার পরিবেশকে পুরোপুরি ভঙ্গুর করে তুলবে। এ অবস্থায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে নিরপেক্ষ ও কঠোর হয়ে নিজেদের আইনি অবস্থান স্পষ্ট করার পাশাপাশি শিক্ষার স্বাভাবিক পরিবেশ বজায় রাখতে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানানো হচ্ছে।

