ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক জুলাই বিপ্লবের অবিনাশী চেতনাকে ধারণ করে একটি বৈষম্যহীন, গণতান্ত্রিক এবং ইনসাফভিত্তিক বাংলাদেশ গড়ার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) প্রক্টর। ফ্যাসিবাদ মুক্ত হওয়ার দ্বিতীয় বর্ষে পদার্পণ উপলক্ষে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় রিপোর্টার্স ইউনিটির (জবিরিইউ) নেতৃবৃন্দের সাথে এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে তিনি দেশের সার্বিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি, জুলাই আন্দোলনের পটভূমি, শহীদদের আত্মত্যাগ এবং ভবিষ্যৎ করণীয় সম্পর্কে সুচিন্তিত মতামত তুলে ধরেন।
সাক্ষাৎকারকালে জবি প্রক্টর মহান মুক্তিযুদ্ধের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসকে গভীর শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করে ১৯৭১ এবং ২০২৪-এর অভ্যুত্থানের মেলবন্ধনের ওপর জোর দেন। তিনি বলেন, আমরা ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের ভিত্তিকে যেমন অস্বীকার করতে পারি না, তেমনি ২০২৪ সালের জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানকেও ছোট করে দেখার কোনো অবকাশ নেই। দীর্ঘ ১৭ বছরের রাজনৈতিক বঞ্চনা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা হরণ এবং সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর চলা কাঠামোগত নিপীড়নের বিরুদ্ধে প্রাথমিকভাবে কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলন শুরু হয়েছিল। পরবর্তীতে তা ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার বিরুদ্ধে দেশের সর্বস্তরের মানুষের এক দফার আন্দোলনে রূপ নেয়।
আন্দোলনের দিনগুলোর রোমহর্ষক ও মর্মান্তিক স্মৃতির কথাচারণ করতে গিয়ে প্রক্টর আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন। তিনি বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ আবু সাঈদের বুক পেতে দেওয়ার সাহসিকতা এবং পুলিশের নির্মম গুলির দৃশ্য স্মরণ করেন। এছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র-জনতাকে পানি বিতরণকালে গুলিবিদ্ধ হয়ে শহীদ মুগ্ধের শেষ মুহূর্তের আকুতি এবং হেলিকপ্টার থেকে তিন বছরের শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যুর মতো হৃদয়বিদারক ঘটনাগুলো গোটা জাতিকে কীভাবে নাড়া দিয়েছিল, তা তুলে ধরেন। তিনি উল্লেখ করেন, এই আন্দোলন কেবল নির্দিষ্ট কোনো রাজনৈতিক দল বা ছাত্র সংগঠনের ছিল না; এটি ছিল রিকশাচালক, মুদি দোকানদার থেকে শুরু করে শিশু-বৃদ্ধ নির্বিশেষে বাংলার আপামর জনসাধারণের স্বতঃস্ফূর্ত সংগ্রাম।
শহীদ পরিবার ও আহতদের পুনর্বাসনের বিষয়ে রাষ্ট্রকে আরও দায়িত্বশীল হওয়ার আহ্বান জানিয়ে প্রক্টর বলেন, নিহতদের পরিবারকে নিয়মিত আর্থিক ও সামাজিক সহায়তা প্রদান করতে হবে। একই সাথে, আহতদের সুচিকিৎসা নিশ্চিত করতে এবং প্রয়োজনে উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে পাঠিয়ে তাদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে রাষ্ট্রযন্ত্রের সর্বোচ্চ মনোযোগ প্রয়োজন।
দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে প্রক্টর একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও আশাব্যঞ্জক দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেন। তিনি বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর দেশে একটি গণতান্ত্রিক সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করেছে। ফ্যাসিস্ট কায়দায় যারা দেশ পরিচালনা করেছে এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের সাথে যুক্ত ছিল, তাদের যথাযথ আইনি প্রক্রiyay বিচারের আওতায় আনতে হবে। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বিগত দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা গুম, খুন ও নির্যাতনের শিকার হয়ে নিজে চরম নিপীড়নের মধ্য দিয়ে গেছেন বিধায় তিনি এসব জঘন্য অপরাধের বাস্তব চিত্র সম্পর্কে সম্পূর্ণ ওয়াকিবহাল রয়েছেন বলে প্রক্টর মন্তব্য করেন।
উপসংহারে জবি প্রক্টর আশা প্রকাশ করেন যে, বর্তমান প্রশাসন অত্যন্ত সতর্ক ও সংবেদনশীল ভূমিকা পালন করবে, যাতে ভবিষ্যতে আর কখনোই ‘আয়নাঘর’ বা কোনো নব্য ফ্যাসিবাদী শাসনব্যবস্থার পুনরাবৃত্তি না ঘটে। জনগণের অকৃত্রিম আস্থা অর্জনের জন্য সরকারকে সর্বোচ্চ সংযম ও দূরদর্শিতার সাথে কাজ করার তাগিদ দিয়ে তিনি বলেন, শতবর্ষে এমন গণআন্দোলন কদাচিৎ দেখা যায়। ফ্যাসিবাদের কবল থেকে মুক্ত হওয়া এই স্বাধীন ভূখণ্ডে এমন আন্দোলনের পুনরাবৃত্তি রোধে সবাইকে সচেতন থাকার আহ্বান জানান তিনি।

