২০২৪ সালের ঐতিহাসিক জুলাই গণ-অভ্যুত্থান ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অনন্য ও পরিবর্তনের টার্নিং পয়েন্ট। এই আন্দোলনের প্রাক্কালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ ছাত্র-ছাত্রী থেকে শুরু করে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও কওমি মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা যেভাবে রাজপথে নিজেদের প্রস্তুত করেছিল, তার গভীরে লুকিয়ে রয়েছে আত্মত্যাগ, বঞ্চনা আর পরিবর্তনের দীর্ঘ আকুতি। আন্দোলনের বিভিন্ন পর্যায়ে নেতৃত্ব দেওয়া তরুণ ও তরুণীদের সাক্ষাৎকার সংগ্রহ করতে গিয়ে শিক্ষাবিদ ও গবেষকদের অভিজ্ঞতা উন্মোচন করেছে এক অভাবনীয় চিত্র। কোনো সুসংগঠিত কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব না থাকলেও, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্দোলনের সময়রেক্ষাকে অনুসরণ করে স্কুল, কলেজ, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এবং মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা নিজ দায়িত্বে রাজপথে নেমে আসে।
তদন্ত ও সাক্ষাৎকারে উঠে এসেছে এক নির্মম অথচ সত্য রূপ। সরকারি চাকরিতে কোটার সংস্কার দাবি নিয়ে এই আন্দোলন শুরু হলেও এর সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে ছিল মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত হতাশা ও ক্ষোভ। বিগত দেড় দশকে রাজনৈতিক নিপীড়ন, সামাজিক বৈষম্য এবং অর্থনৈতিক টানাপোড়েনের শিকার হওয়া সাধারণ মানুষ এই ছাত্র আন্দোলনের মাধ্যমে বিস্ফোরণ ঘটায়। বিশেষ করে, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও কওমি মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। অথচ সমাজের একটি বড় অংশ মনে করত মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা মূলধারার রাজনীতি বা সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন। কিন্তু বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। তাদের পরিবারের সদস্যরা সাধারণ শিক্ষায় পড়াশোনা করায় এবং তথাকথিত ‘জঙ্গি’ ট্যাগ বা সামাজিক বৈষম্যের শিকার হওয়ায় তাদের মনে জমে থাকা ক্ষোভ জুলাই অভ্যুত্থানে বিস্ফোরণ ঘটিয়েছিল।
আন্দোলনের দিনগুলোতে সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীরা ছিল সম্পূর্ণ নিরস্ত্র, অথচ আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী ও সরকারদলীয় ক্যাডাররা ছিল আক্রমণাত্মক। বনানীর ফ্লাইওভারের কাছে গুলিতে আহত এক পথশিশুর শেষ নিশ্বাস পর্যন্ত তার হাত ধরে রাখা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সমন্বয়ক ইব্রাহিম মুন্নার অভিজ্ঞতা কিংবা আফতাবনগরে উত্তপ্ত জনতাকে শান্ত করার প্রয়াস চালানো সমন্বয়ক নাজিফা জান্নাতের মতো অসংখ্য তরুণের মানবিক রূপ এই আন্দোলনের মূল শক্তি ছিল। শুধু তাই নয়, হাজার হাজার সাধারণ মানুষ খাবার, পানি, অর্থ ও নিরাপদ আশ্রয় দিয়ে এই গণ-আন্দোলনকে বাঁচিয়ে রেখেছিল। জেন-জি প্রজন্মের এই সফল ও স্বতঃস্ফূর্ত তৃণমূল আন্দোলন প্রমাণ করেছে যে, দেশের তরুণ সমাজ বৈষম্যহীন ও নতুন এক বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্নে কতটা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। ঐতিহাসিক এই দলিল সংরক্ষণের মাধ্যমে ভবিষ্যতের গবেষকরা জানতে পারবেন কীভাবে সাধারণ ঘরের সন্তানরা কোনো আনুষ্ঠানিক রাজনৈতিক দল ছাড়াই শুধু দেশের টানে রাজপথে বুক পেতে দিয়েছিল।

