গোপালগঞ্জ জেলা জজ আদালতের এজলাসের ভেতরে বিচারকের উক্ষিপ্ত আচরণের শিকার হয়ে গুরুতর আহত হয়েছেন সাবিহা সুলতানা নামের এক শিক্ষানবিশ নারী আইনজীবী। বিচারকের টেবিল থেকে ছুড়ে মারা একটি ভারী কাচের পেপারওয়েট সরাসরি তাঁর মাথার ডান পাশে আঘাত হানে, যার ফলে ঘটনাস্থলেই তিনি রক্তাক্ত জখম হন। ঘটনার পরপরই আইজীবী মহলে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয় এবং তাৎক্ষণিকভাবে বিচারিক কার্যক্রম বর্জনসহ দোষী বিচারকের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থার দাবি জানান স্থানীয় আইনজীবীরা।
আদালত ও প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা যায়, বুধবার দুপুরে গোপালগঞ্জ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত-২-এ বিচারিক কার্যক্রম পরিচালনার সময় এই অনভিপ্রেত ঘটনা ঘটে। ঘটনার দিন আদালতের এজলাসের পেছনের সারিতে দাঁড়িয়ে থাকা কয়েকজন আইনজীবীর ফিসফিসানি ও কথাবার্তায় বিচারক মো. সুজন মিয়া চরম বিরক্ত হন। বিচারক প্রথমে এজলাসের টেবিলে সজোরে হাত চাপড়ে তাদের নিরব থাকার নির্দেশ দেন। কিন্তু পরিবেশ শান্ত না হওয়ায় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে তিনি টেবিল থেকে একটি কাচের পেপারওয়েট ক্ষিপ্ত হয়ে ছুড়ে মারেন। দুর্ভাগ্যবশত, সেটি কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে না গিয়ে দর্শকসারিতে বা এজলাসের কাজে থাকা শিক্ষানবিশ আইনজীবী সাবিহা সুলতানার মাথায় আঘাত করে।
আহত সাবিহা সুলতানা তাৎক্ষণিক আতঙ্ক ও যন্ত্রণায় জ্ঞান হারিয়ে ফেলার উপক্রম হন। তাঁর মাথা দিয়ে প্রচুর রক্তপাত হতে শুরু করলে সহকর্মী আইনজীবীরা দ্রুত তাঁকে উদ্ধার করেন এবং গোপালগঞ্জ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সার্জারি বিভাগে নিয়ে যান। বর্তমানে তিনি সেখানেই চিকিৎসাধীন রয়েছেন। হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, কপালে বড় ধরনের সেলাই এড়ানো সম্ভব হলেও মাথায় মারাত্মক অভ্যন্তরীণ আঘাতের কারণে তাকে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। প্রথম আলোকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে সাবিহা জানান, তিনি সম্পূর্ণ নিরিবিলিভাবে নিজের সেরেস্তার ফাইলপত্র দেখছিলেন, এমন সময় আকস্মিক এই হামলায় তিনি বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েন।
এই নজিরবিহীন ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়লে গোপালগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক এম এ আলম সেলিমের নেতৃত্বে আইনজীবীরা দ্রুত চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের কার্যালয়ে গিয়ে তীব্র প্রতিবাদ জানান এবং মৌখিক অভিযোগ দায়ের করেন। আইনজীবী নেতারা স্পষ্টভাবে জানান, বিচারকের আসন থেকে এ ধরনের হিংসাত্মক আচরণ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। বিচারিক পদের মর্যাদা এবং আইনি অঙ্গনের নিরাপত্তার স্বার্থে তাঁরা অবিলম্বে ওই বিচারককে বিচারিক দায়িত্ব থেকে অপসারণের জোরালো দাবি জানান। পরবর্তীতে প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে অভিযুক্ত বিচারক মো. সুজন মিয়ার আমলি ক্ষমতা বা কগনিজেন্স পাওয়ার প্রত্যাহার করা হয় এবং এসংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করা হয় বলে নিশ্চিত করেছেন জজ আদালতের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মনিরুল ইসলাম।
আইনজীবী সমিতির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, উদ্ভূত পরিস্থিতি সুরাহা করতে এবং বিচার বিভাগের ভাবমূর্তি অক্ষুণ্ন রাখতে বৃহস্পতিবার সকালে চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট এবং জেলা জজের সঙ্গে আইনজীবী সমিতির নেতৃবৃন্দের একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। বিচারকের মতো একটি দায়িত্বশীল আসনে বসে এমন আচরণ বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও আইনজীবীদের নিরাপত্তার ওপর বড় ধরনের হুমকি কি না, তা নিয়ে এখন গোটা আইনি অঙ্গনে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। সাধারণ আইনজীবীদের দাবি, শুধু ক্ষমতা প্রত্যাহারই যথেষ্ট নয়, এই ঘটনার একটি নিরপেক্ষ বিচার বিভাগীয় তদন্ত হওয়া উচিত যাতে ভবিষ্যতে বিচারালয়ের পবিত্রতা রক্ষা পায়।

