বাংলা চলচ্চিত্রের কালজয়ী অভিনেত্রী ফরিদা আক্তার ববিতা এবং আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায়ের প্রথম সাক্ষাতের স্মৃতি নিয়ে সম্প্রতি এক বিশেষ আড্ডায় মুখোমুখি হয়েছেন কবি ও কথাসাহিত্যিক আনিসুল হক। প্রথম আলো ডটকমের নিয়মিত বিশেষ আয়োজন ‘ক্রাউন সিমেন্ট অভিজ্ঞতার আলো’ অনুষ্ঠানটিতে দেশের প্রখ্যাত এই চিত্রতারকা তাঁর দীর্ঘ অভিনয় জীবনের অজানা ও রোমাঞ্চকর অনেক অভিজ্ঞতা শেয়ার করেন। সাক্ষাৎকারজুড়ে উঠে আসে অস্কারবিজয়ী পরিচালক সত্যজিৎ রায়ের ‘অশনি সংকেত’ চলচ্চিত্রে তাঁর অন্তর্ভুক্তির গল্প এবং কিংবদন্তি এই পরিচালকের সঙ্গে তাঁর প্রথম সাক্ষাতের অমলিন ঘটনার কথা।
ঘটনাটি ১৯৭০-এর দশকের শুরুর দিকের। প্রখ্যাত ভারতীয় চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায় তাঁর ‘অশনি সংকেত’ ছবির প্রধান নারী চরিত্র ‘অনঙ্গ বউ’-এর জন্য একজন উপযুক্ত ও সাধারণ চেহারার গ্রামীণ নারী চরিত্র খুঁজছিলেন। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের (বর্তমান বাংলাদেশ) উদীয়মান তরুণী ববিতার কিছু আলোকচিত্র দেখে তিনি তাঁকে কলকাতায় অডিশনের জন্য আমন্ত্রণ জানান। তবে কিংবদন্তি পরিচালকের মুখোমুখি হওয়ার আগে তরুণী ববিতা বেশ প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। ভারী মেকআপ, জমকালো পোশাক ও অলঙ্কারে সজ্জিত হয়ে যখন তিনি সত্যজিৎ রায়ের সামনে উপস্থিত হন, তখন প্রখ্যাত এই নির্মাতা কৌতুকপূর্ণ ও বিস্ময়ভরা সুরে প্রশ্ন করেছিলেন, ‘তুমি এত সেজেগুজে এসেছ কেন?’ সত্যজিৎ রায়ের এই সহজ-সরল ও অকপট প্রশ্নে সেদিন কিছুটা লজ্জিত ও অবাক হয়েছিলেন তরুণী ববিতা।
অনুষ্ঠানে আনিসুল হকের প্রশ্নের উত্তরে ববিতা জানান, গ্রামবাংলার একজন সাধারণ নারীর চরিত্রে অভিনয় করার জন্য সত্যজিৎ রায় কেমন কৃত্রিমতাহীন ও স্বাভাবিক রূপ খুঁজছিলেন, তা তিনি প্রথমে অনুধাবন করতে পারেননি। এরপর সত্যজিৎ রায় তাঁকে মেকআপ ধুয়ে সম্পূর্ণ স্বাভাবিক চেহারায় সামনে হাজির হতে বলেন। মেকআপ তুলে ফেলার পরেই মহান এই নির্মাতা ববিতার ভেতরের কাঙ্ক্ষিত গ্রামীণ রূপটি খুঁজে পান এবং ‘অনঙ্গ বউ’ চরিত্রের জন্য তাঁকে চূড়ান্ত করেন। পরবর্তীতে ১৯৭৩ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘অশনি সংকেত’ চলচ্চিত্রে ববিতার সাবলীল ও অনবদ্য অভিনয় আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র অঙ্গনে দারুণ প্রশংসিত হয় এবং বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের মান বহুলাংশে বাড়িয়ে দেয়।
চলচ্চিত্র জীবনের এই স্বর্ণালী স্মৃতিচারণের পাশাপাশি ববিতা তাঁর শৈশব, চলচ্চিত্রে আগমন এবং বাংলাদেশের সিনেমা শিল্পের সুবর্ণ যুগের নানাবিধ অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন। জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারপ্রাপ্ত এই গুণী অভিনেত্রী জানান, সত্যজিৎ রায়ের সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা ও সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণ পর্যবেক্ষণ কৌশল তাঁর অভিনয় জীবনের দৃষ্টিভঙ্গি পুরোপুরি বদলে দিয়েছিল। আনিসুল হকের চমৎকার সঞ্চালনায় ‘অভিজ্ঞতার আলো’ শীর্ষক এই আড্ডায় গুণীজনের জীবনের অজানা গল্প তুলে ধরার যে প্রয়াস চালানো হচ্ছে, তা বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সংস্কৃতিমনস্ক মানুষের জন্য অত্যন্ত অনুপ্রেরণাদায়ক বলে মনে করছেন চলচ্চিত্র বিশ্লেষকরা।
বাংলাদেশের চলচ্চিত্র জগতের অনন্য নক্ষত্র ফরিদা আক্তার ববিতা পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে দর্শকনন্দিত অভিনয়ে অবদান রেখে চলেছেন। সত্যজিৎ রায়ের ‘অশনি সংকেত’ ছাড়াও ‘নয়নমণি’, ‘গোলাপী এখন ট্রেনে’, ‘অনন্ত প্রেম’ ও ‘লাঠিয়াল’-এর মতো অজস্র কালজয়ী চলচ্চিত্রে তাঁর উপস্থিতি বাংলা সিনেমাকে সমৃদ্ধ করেছে। সাহিত্যিক আনিসুল হকের সঙ্গে প্রখ্যাত এই অভিনেত্রীর অমূল্য আড্ডাটি প্রবীণ ও নবীন সকল দর্শকের কাছে চলচ্চিত্র ইতিহাসের এক অনন্য দলিল হিসেবে স্থান করে নিয়েছে।

