আধুনিক প্রযুক্তির সহজলভ্যতার এই যুগে তরুণ প্রজন্ম ও শিশুদের মধ্যে ইন্টারনেট ও ডিজিটাল ডিভাইসের ওপর নির্ভরতা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। মাদক গ্রহণের মতো অতিরিক্ত মোবাইল ব্যবহার, টিকটক আসক্তি কিংবা পাবজি ও ফ্রি ফায়ারের মতো অনলাইন গেমের প্রতি ঝোঁকও মানুষের মস্তিষ্কে একই ধরনের রাসায়নিক প্রতিক্রিয়া তৈরি করে। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় ‘নেট অ্যাডিকশন’ বা ইন্টারনেট আসক্তি, যা মূলত একটি জটিল মানসিক রোগ। সম্প্রতি প্রথম আলো ট্রাস্ট আয়োজিত বিনা মূল্যে মাদকবিরোধী পরামর্শ সহায়তার ১৭৮তম অনলাইন সভায় দেশের শীর্ষস্থানীয় মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ এবং জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. মোহিত কামাল এ বিষয়ে তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
‘ই-সিগারেট ধূমপান ছাড়ার কার্যকর বা নিরাপদ বিকল্প নয়’—শীর্ষক এই অনলাইন আলোচনা সভায় বিশেষজ্ঞরা নিকোটিন ও ডিজিটাল আসক্তির নানা ক্ষতিকর দিক তুলে ধরেন। সাধারণ মানুষের একটি বহুল প্রচলিত ধারণা রয়েছে যে, প্রচলিত সিগারেট ছেড়ে ইলেকট্রনিক সিগারেট বা ভ্যাপিং শুরু করলে ধূমপানের ক্ষতি থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। তবে ডা. মোহিত কামাল এই ধারণাকে সম্পূর্ণ ভুল ও বিভ্রান্তিকর হিসেবে আখ্যায়িত করেন। তিনি জানান, ই-সিগারেটে ব্যবহৃত কেমিক্যাল ও নিকোটিন শরীর এবং মস্তিষ্কের জন্য সমান ক্ষতিকর। এটি ধূমপান ছাড়ার কোনো বৈজ্ঞানিক বা নিরাপদ সমাধান নয়, বরং আসক্তির পথকে আরও সুগম করে তোলে।
আলোচনাসভায় মাদকের পাশাপাশি ডিজিটাল মাধ্যম ব্যবহারের নেতিবাচক প্রভাব নিয়েও বিস্তারিত আলোচনা করা হয়। মাদক গ্রহণ এবং মোবাইল বা সোশ্যাল মিডিয়া আসক্তির মধ্যে কোনো সম্পর্ক রয়েছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে ডা. মোহিত কামাল মস্তিষ্কের জৈবিক প্রক্রিয়ার ব্যাখা দেন। তিনি বলেন, মাদকদ্রব্য সেবন করলে মানব মস্তিষ্কে যে উদ্দীপনা এবং আনন্দের অনুভূতি তৈরি হয়, তার পেছনে মূল ভূমিকা পালন করে ‘ডোপামিন’ নামের একটি নিউরোট্রান্সমিটার বা হরমোন। আশ্চর্যের বিষয় হলো, যখন কোনো শিশু বা কিশোর অতিরিক্ত মোবাইল ব্যবহার করে, দীর্ঘ সময় টিকটকের মতো স্বল্পদৈর্ঘ্য ভিডিও দেখতে থাকে বা ঘণ্টার পর ঘণ্টা পাবজি ও ফ্রি ফায়ারের মতো রক্তক্ষয়ী অনলাইন গেমে নিমগ্ন থাকে, তখনও মস্তিষ্কে একইভাবে অতিরিক্ত ডোপামিন নিঃসৃত হয়।
এই প্রক্রিয়ার ফলে ধীরে ধীরে তৈরি হয় ‘ডোপামিন ডিপেনডেন্সি’ বা রাসায়নিক নির্ভরতা। ডা. মোহিত কামাল সতর্ক করে জানান, ইন্টারনেট বা ডিজিটাল আসক্তি কেবল সময়ের অপচয় নয়, এটি সরাসরি একজন মানুষের মানসিক স্বাস্থ্য ধ্বংস করে দেয়। বিশেষ করে শিশু-কিশোরদের মেধা ও মনন বিকাশে এটি মারাত্মক প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে। এই আসক্তির কারণে শিশুদের মনোযোগের ক্ষমতা বা ফোকাস কমে যায়, পড়াশোনায় চরম ধস নামে এবং চিন্তাশক্তি হ্রাস পায়। এছাড়া অতিরিক্ত ডিজিটাল আসক্তদের মেজাজ খিটখিটে হয়ে ওঠে, তারা কথায় কথায় আক্রমণাত্মক আচরণ করে এবং পরিবার ও সমাজ থেকে নিজেদের বিচ্ছিন্ন করে ফেলে।
বর্তমান ডিজিটাল যুগে এই প্রচ্ছন্ন ব্যাধি থেকে মুক্তি পেতে অভিভাবক ও সমাজের সচেতনতার ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের মতে, ডিজিটাল ডিভাইস ব্যবহারের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ করে দেওয়া জরুরি। শিশুদের কেবল প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীল না রেখে খেলাধুলা, বই পড়া ও সামাজিক যোগাযোগের মতো বাস্তবমুখী কর্মকাণ্ডে উৎসাহিত করতে হবে। একইসঙ্গে পরিবারে ইতিবাচক ও সখ্যের পরিবেশ বজায় রাখা অত্যন্ত প্রয়োজন, যাতে সন্তানরা মানসিক কোনো বিষণ্নতা বা একাকীত্ব কাটানোর জন্য অনলাইন জগতে আশ্রয় না নেয়। যদি কারও মধ্যে ইন্টারনেটের চরম আসক্তি বা আচরণের গুরুতর পরিবর্তন দেখা দেয়, তবে বিলম্ব না করে অভিজ্ঞ মনোরোগ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত বলে মতামত ব্যক্ত করেন ডা. মোহিত কামাল।

