মানব সভ্যতার সূচনালগ্ন থেকেই সময়কে জয় করার আকুল আকাঙ্ক্ষা মানুষকে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে। প্রতিদিনের ব্যস্ত জীবন থেকে শুরু করে বৈজ্ঞানিক গবেষণাগার—সবখানেই একটি চিরন্তন প্রশ্ন ঘোরাফেরা করে: অতীতে ফিরে গিয়ে কোনো ভুল সিদ্ধান্ত শুধরে নিয়ে কি বর্তমান বা ভবিষ্যৎ বদলে দেওয়া সম্ভব? কল্পবিজ্ঞানের গল্প, সিনেমা কিংবা সাহিত্যের পাতায় এই ধারণা নতুন নয়। তবে আধুনিক তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞান এবং মহাকাশ গবেষণার বিকাশ এই কাল্পনিক ভাবনাকে নিয়ে এসেছে গভীর বৈজ্ঞানিক আলোচনার কেন্দ্রে। বিজ্ঞানের ভাষায় সময় ভ্রমণের এই পুরো বিষয়টিকে মূলত দুটি ভাগে বিভক্ত করে আলোচনা করা হয়—’টাইম ট্রাভেল’ এবং ‘টাইম লুপ’।
সাধারণ ভাষায় ‘টাইম ট্রাভেল’ বলতে বোঝায় সময়ের একমুখী সরলরেখা ধরে অতীত কিংবা ভবিষ্যতের দিকে যাতায়াত করা। অন্যদিকে, ‘টাইম লুপ’ হলো সময়ের একটি নির্দিষ্ট খণ্ডাংশ বা সময়চক্রে বারবার আটকে থাকা, যেখানে কোনো ব্যক্তি একই দিনের ঘটনাপ্রবাহ একের পর এক প্রত্যক্ষ বা অভিজ্ঞতা করতে থাকেন। কাল্পনিক সাহিত্য ও চলচ্চিত্রজগতে এই দুটি ধারণাই দারুণ জনপ্রিয়। ১৮৯৫ সালে এইচ জি ওয়েলসের বিখ্যাত উপন্যাস ‘দ্য টাইম মেশিন’-এর মাধ্যমে মানুষ প্রথম বৈজ্ঞানিক রূপরেখায় সময় ভ্রমণের ধারণার সঙ্গে পরিচিত হয়। পরবর্তী সময়ে ‘ব্যাক টু দ্য ফিউচার’, ‘ডার্ক’, ‘অ্যাভেঞ্জার্স: এন্ডগেম’-এর মতো জনপ্রিয় চলচ্চিত্র ও সিরিজ এবং ‘গ্রাউন্ডহগ ডে’ বা ‘এজ অব টুমরো’-র মতো বিখ্যাত সিনেমাগুলো দর্শককে সময়ের এই জটিল চক্রের গোলকধাঁধায় বুঁদ করে রেখেছে।
তবে কেবল রূপালি পর্দাতেই নয়, সময় ভ্রমণ নিয়ে আলোচনা করতে গেলে উঠে আসে দুটি জটিল তাত্ত্বিক যুক্তি বা প্যারাডক্স। এর প্রথমটি হলো ‘গ্র্যান্ডফাদার প্যারাডক্স’। এই যুক্তি অনুযায়ী, যদি কোনো ব্যক্তি অতীতে ফিরে গিয়ে নিজের দাদা-দাদির বিবাহ কিংবা অস্তিত্ব বিনষ্ট করে দেন, তবে বাস্তবে সেই ব্যক্তির জন্ম হওয়া অসম্ভব। আর যদি তাঁর জন্মই না হয়, তবে অতীতে গিয়ে সেই ঘটনা ঘটাল কে—এই প্রশ্নটি সময় ভ্রমণের কার্যকারণ সম্পর্ককে চরম চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দেয়। দ্বিতীয় জনপ্রিয় যুক্তিটি হলো ‘বুটস্ট্র্যাপ প্যারাডক্স’। উদাহরণস্বরূপ, কেউ যদি ভবিষ্যৎ থেকে একটি বিখ্যাত সাহিত্যকর্মের বই এনে অতীতে মূল লেখকের হাতে তুলে দেন এবং লেখক সেটি হুবহু প্রকাশ করেন, তবে সেই সৃষ্টির আসল উৎস বা সৃষ্টিকর্তা কে—তা নিয়ে তৈরি হয় জটিল বিভ্রম।
বাস্তব বিজ্ঞান কি সময় ভ্রমণকে সমর্থন করে? আধুনিক পদার্থবিজ্ঞান অনুযায়ী, ভবিষ্যতের দিকে ভ্রমণ করা তত্ত্বগত ও প্রযোগমূলকভাবে সম্ভব। মহান বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতার তত্ত্ব অনুসারে, সময় কোনো নির্দিষ্ট ও স্থির বস্তু নয়। মহাকর্ষ বল ও গতির ওপর নির্ভর করে সময়ের গতি ধীর বা দ্রুত হতে পারে, যাকে পদার্থবিজ্ঞানের ভাষায় ‘টাইম ডাইলেশন’ বলা হয়। উদাহরণস্বরূপ, আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে দীর্ঘ সময় অবস্থান করা মহাকাশচারীরা তীব্র গতিতে পৃথিবী প্রদক্ষিণ করার কারণে পৃথিবীর সাধারণ মানুষের তুলনায় সামান্য ধীরে বয়সের হিসাব অতিক্রম করেন। প্রখ্যাত রুশ মহাকাশচারী সার্গেই ক্রিকালিয়েভ মহাকাশে মোট ৮০৩ দিন অবস্থান শেষে পৃথিবীতে ফেরার পর গাণিতিকভাবে দেখা যায়, তিনি সাধারণ মানুষের চেয়ে ০.০২ সেকেন্ড ভবিষ্যতে পৌঁছে গিয়েছেন। এটি কোনো কল্পকাহিনী নয়, বরং বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে প্রমাণিত সত্য।
তবে ভবিষ্যতের দিকে ভ্রমণ আংশিক সম্ভব হলেও অতীতে ফিরে যাওয়া কিংবা সময়চক্রে আটকে পড়া বাস্তবে অত্যন্ত কঠিন ও প্রায় অসম্ভব। মহাবিশ্বে ‘ওয়ার্মহোল’ বা মহাজাগতিক সুড়ঙ্গ ব্যবহার করে অতীতে যাওয়ার তাত্ত্বিক সম্ভাবনা থাকলেও বিজ্ঞানীরা তা বাস্তবায়নে বড় ধরনের সংশয় প্রকাশ করেন। বিখ্যাত পদার্থবিজ্ঞানী স্টিফেন হকিং তাঁর ‘ক্রোনোলজি প্রটেকশন কনজেকচার’ তত্ত্বে উল্লেখ করেন, মহাবিশ্বের নিয়ম ও শৃঙ্খলা বজায় রাখতে প্রকৃতি নিজেই পদার্থবিজ্ঞানের নির্দিষ্ট সূত্র দিয়ে অতীতে যাওয়া রোধ করে রেখেছে। ফলে অতীতে গিয়ে ইতিহাস বদলে দেওয়ার প্রাচীন মানবীয় আকাঙ্ক্ষা বাস্তবে হয়তো অধরাই থেকে যাবে, কিন্তু বিজ্ঞান ও কল্পনার এই অপূর্ব মেলবন্ধন বিশ্বজুড়ে গবেষক ও চিন্তাবিদদের চিরকাল রোমাঞ্চিত করে রাখবে।

