ইতালি যাওয়ার একটি বিপদসংকুল ও অবৈধ পথে যাত্রা করে লিবিয়ায় পৌঁছানোর পর মানবপাচারকারী চক্রের বর্বর নির্যাতনে মাদারীপুরের এক যুবকের মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। এই হৃদয়বিদারক ঘটনায় গোটা এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে এবং নিহতের পরিবার গভীর কান্নায় ভেঙে পড়েছে। ভুক্তভোগী পরিবারের অভিযোগ, ইউরোপে উন্নত জীবনের স্বপ্ন দেখিয়ে দালালের দল বিভিন্ন দফায় প্রায় ৬০ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয়। কিন্তু কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়ার বদলে লিবিয়ায় আটকে রেখে তার ওপর অমানবিক শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালানো হয়, যা শেষ পর্যন্ত তার প্রাণ কেড়ে নেয়।
প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, বাংলাদেশ থেকে একটি সংঘবদ্ধ মানবপাচারকারী চক্র লিবিয়ার মরুভূমি ও সমুদ্রপথ হয়ে অবৈধভাবে ইতালি পাঠানোর প্রলোভন দেখিয়ে ওই তরুণকে বাড়ি থেকে নিয়ে যায়। আন্তর্জাতিক অভিবাসন ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, লিবিয়া দীর্ঘদিন ধরে ইউরোপগামী অবৈধ অভিবাসীদের জন্য একটি অত্যন্ত বিপজ্জনক ট্রানজিট রুট হিসেবে পরিচিত। সেখানে সক্রিয় বিভিন্ন অপরাধী চক্র ও সশস্ত্র গোষ্ঠী প্রায়ই অভিবাসীদের জিম্মি করে মুক্তিপণ আদায় করে এবং যারা টাকা দিতে ব্যর্থ হয় বা পরিবার থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করতে চায়, তাদের ওপর চলে পৈশাচিক নির্যাতন। মাদারীপুরের এই যুবকের ক্ষেত্রেও ঠিক একই ধরনের নৃশংসতা চালানো হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
নিহতের পরিবারের সদস্যরা অত্যন্ত মানবেতর জীবনযাপন করছেন এবং তাদের একমাত্র উপার্জনক্ষম সন্তানকে হারিয়ে দিশাহারা হয়ে পড়েছেন। চড়া সুদে ঋণ নিয়ে এবং ভিটেমাটি বন্ধক রেখে তারা দালালের হাতে লাখ লাখ টাকা তুলে দিয়েছিলেন। অথচ এখন সন্তানের জীবিত মুখ তো দূরের কথা, তার নিথর দেহটি দেশে ফিরিয়ে আনার জন্যও দ্বারে দ্বারে ঘুরতে হচ্ছে তাদের। সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, পররাষ্ট্র দফতর এবং লিবিয়ায় অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসের প্রতি আকুল আবেদন জানিয়েছে পরিবারটি, যেন দ্রুততম সময়ের মধ্যে আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে যুবকের মরদেহটি স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয় এবং এই হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িত মূল দালালদের আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করা হয়।
এদিকে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো মানবপাচার চক্রের বিরুদ্ধে দেশব্যাপী নজরদারি বাড়িয়েছে বলে জানা গেছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, অবৈধ অভিবাসনের নামে যারা তরুণদের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলছে এবং লিবিয়ার মতো দেশে জিম্মি করে অর্থ আদায় করছে, তাদের একটি দীর্ঘ তালিকা তৈরি করা হয়েছে। ইতোমধ্যে বেশ কয়েকজন দালালকে আটকও করা হয়েছে। তবে সচেতন মহল মনে করছেন, কেবল আইন প্রয়োগ করে এই অপরাধ দমন সম্ভব নয়; এর জন্য প্রয়োজন জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং অবৈধ পথে বিদেশ যাত্রার ঝুঁকি সম্পর্কে তরুণদের ব্যাপকভাবে অবহিত করা, যাতে আর কোনো তরুণকে এভাবে অকালে প্রাণ হারাতে না হয়।

