দীর্ঘদিনের রক্তক্ষয়ী সংঘাত ও ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞের পর অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় দীর্ঘমেয়াদি শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ সমঝোতায় পৌঁছেছে ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সশস্ত্র সংগঠন হামাস এবং ইসরায়েল। গাজাবাসীকে নির্বিচার হামলা, প্রাণহানি এবং ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদের হাত থেকে রক্ষা করতে নিজেদের অস্ত্র সমর্পণে নমনীয় অবস্থান গ্রহণ করেছে হামাস। বিনিময়ে গাজা উপত্যকা থেকে ধাপে ধাপে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী পুরোপুরি প্রত্যাহার করে নেওয়ার বিষয়ে দুই পক্ষ সম্মত হয়েছে। আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতাকারী দেশগুলো এবং যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ কূটনৈতিক উদ্যোগে এ সমঝোতা চূড়ান্ত রূপ পাচ্ছে বলে নিশ্চিত করেছেন সংগঠনটির শীর্ষ নেতারা।
হামাসের শক্তিশালী আলোচক দলের জ্যেষ্ঠ সদস্য গাজী হামাদ ফিলিস্তিনি বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষা এবং যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজার পুনর্গঠন প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করার স্বার্থেই এই কৌশলগত নমনীয়তার কথা জানান। তবে অস্ত্র নিয়ন্ত্রণের এই স্পর্শকাতর প্রক্রিয়ায় ইসরায়েল কোনো ধরনের সরাসরি হস্তক্ষেপ বা কর্তৃত্ব তৈরি করতে পারবে না বলে শর্ত দেওয়া হয়েছে। নিরস্ত্রীকরণের পুরো বিষয়টি পরিচালনা ও তদারকির মূল দায়িত্ব পালন করবে নবগঠিত ‘ন্যাশনাল কমিটি ফর অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অব গাজা’ (এনসিএজি) বা গাজা প্রশাসন বিষয়ক জাতীয় কমিটি। পূর্বনির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী এই নিরপেক্ষ কমিটিই গাজার সমস্ত অস্ত্রের তালিকা তৈরি, জমা গ্রহণ এবং সুরক্ষার একক কর্তৃত্ব লাভ করবে।
আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও এই সমঝোতা নিয়ে ব্যাপক ইতিবাচক সাড়া দেখা গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের উদ্যোগে গঠিত ‘বোর্ড অব পিস’ বা শান্তি পর্ষদ এই পুরো প্রক্রিয়া তদারকির দায়িত্বে রয়েছে। ট্রাম্প তাঁর নিজস্ব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক বার্তায় উল্লেখ করেন, গাজায় স্থায়ী স্থিতিশীলতা আনতে এই চুক্তি এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ। তাঁর মতে, এর মাধ্যমে একটি নতুন ফিলিস্তিনি সরকার গঠিত হবে, যা শান্তি পর্ষদের সঙ্গে সমন্বয় রেখে গাজার মানুষের কল্যাণে কাজ করবে। একইসঙ্গে এই চুক্তির ফলে ইসরায়েলও তার কাঙ্ক্ষিত নিরাপত্তা পাবে বলে তিনি দাবি করেন।
তবে চুক্তির সঠিক বাস্তবায়ন নিয়ে হামাসের মনে সংশয় এখনো কাটেনি। গাজী হামাদ স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন, ইসরায়েল যদি চুক্তির কোনো শর্ত লঙ্ঘন করে বা নির্ধারিত সময়ে সেনা প্রত্যাহারে টালবাহানা করে, তবে হামাসও সমঝোতার কোনো ধাপ পালন করবে না। সংগঠনটি প্রত্যাশা করছে, মধ্যস্থতাকারী দেশসমূহ এবং ট্রাম্পের নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক কমিটি ইসরায়েলের প্রতিশ্রুতির প্রতি কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করবে। আন্তর্জাতিক তত্ত্বাবধানে নতুন জাতীয় কমিটি গাজা উপত্যকায় পূর্ণ প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পরই কেবল নিরস্ত্রীকরণের সময়সূচি সচল হবে।
উল্লেখ্য, বিগত সময়ের ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতির মধ্যেও গাজায় প্রতিদিন বিচ্ছিন্ন হামলা ও সহিংসতা লেগে ছিল। ইসরায়েলি বাহিনীর সামরিক অভিযানের মুখে ফিলিস্তিনিদের জীবনযাত্রা বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিল। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এই দীর্ঘস্থায়ী হামলায় ৭৩ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি প্রাণ হারিয়েছেন এবং উপত্যকার সিংহভাগ অবকাঠামো ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে হামাসের অস্ত্র ছাড়ার সিদ্ধান্ত এবং ইসরায়েলি বাহিনী প্রত্যাহারের আন্তর্জাতিক চুক্তি গাজায় চলমান মানবিক বিপর্যয় রোধে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করবে বলে আশা করা হচ্ছে।

