বর্তমান বিশ্বের ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা ও জ্বালানি বাজারের অস্থিতিশীলতা বাংলাদেশের অর্থনীতিতে এক গভীর সংকটের জন্ম দিয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে আমদানিনির্ভর জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল থাকার ফলে দেশটি আজ চরম অর্থনৈতিক ঝুঁকির মুখে। বর্তমানে বাংলাদেশের মোট জ্বালানি চাহিদার ৬০ শতাংশেরও বেশি বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়, যা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করছে। প্রতিদিন জ্বালানি আমদানিতে প্রায় ১২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয় করতে হচ্ছে, যার ফলে সরকারের ভর্তুকির বোঝা প্রতিনিয়ত বাড়ছে। এই পরিস্থিতি কেবল জাতীয় বাজেটের ওপর চাপই সৃষ্টি করছে না, বরং শিল্প উৎপাদন, কৃষি এবং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রাকেও মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে।
গ্যাস ও বিদ্যুতের তীব্র ঘাটতি দেশের শিল্পকারখানাগুলোতে উৎপাদনশীলতা ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ কমিয়ে দিয়েছে, যা সরাসরি তৈরি পোশাক শিল্পের মতো রপ্তানিমুখী খাতের প্রবৃদ্ধিকে বাধাগ্রস্ত করছে। বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোতে গ্যাসের চাহিদার তুলনায় জোগান অনেক কম হওয়ায় লোডশেডিং এখন নিত্যদিনের সঙ্গী। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে দীর্ঘ সময় ধরে বিদ্যুৎ না থাকায় শিক্ষা ও ছোট ব্যবসার ওপর এর বিরূপ প্রভাব পড়ছে। এছাড়া বাংলাদেশের কৌশলগত পেট্রোলিয়াম মজুত সক্ষমতা মাত্র ৩৫ থেকে ৪০ দিনের, যা প্রতিবেশী দেশ চীন বা জাপানের তুলনায় অত্যন্ত নগণ্য। এই দুর্বল অবকাঠামো দেশের জ্বালানি নিরাপত্তাকে প্রতিনিয়ত হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
এই সংকট উত্তরণের একমাত্র টেকসই পথ হলো নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে দ্রুত রূপান্তর। সৌরবিদ্যুৎ বা সোলার এনার্জি দীর্ঘমেয়াদে সাশ্রয়ী এবং এর রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় প্রায় শূন্য। এক মেগাওয়াট সাধারণ বিদ্যুৎ কেন্দ্র চালানোর চেয়ে সমপরিমাণ সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পে বিনিয়োগ অনেক বেশি লাভজনক ও পরিবেশবান্ধব। তবে আমদানিকৃত সোলার সরঞ্জামের ওপর বর্তমানে ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত উচ্চ শুল্ক ও ভ্যাট আরোপ করা হয়েছে, যা স্থানীয় পর্যায়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্প্রসারণে অন্যতম প্রধান বাধা। ভারত, ভিয়েতনাম ও চীনের মতো দেশগুলো যেখানে সৌরবিদ্যুতের প্রসারে কর অব্যাহতি ও সহজ ঋণের ব্যবস্থা করেছে, সেখানে বাংলাদেশের নীতিমালায় আমূল পরিবর্তন আনা জরুরি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারি ও বাণিজ্যিক ভবনগুলোর ছাদে সোলার প্যানেল স্থাপন করে বাংলাদেশে ৩০০ গিগাওয়াট পর্যন্ত সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে। এছাড়া, স্থগিত হয়ে থাকা তিন হাজার মেগাওয়াট ক্ষমতার ৩১টি সোলার বিদ্যুৎ প্রকল্প দ্রুত চালু করা প্রয়োজন। শুল্ক কাঠামোর সংস্কার করে সৌর সরঞ্জামের ওপর বিদ্যমান উচ্চ কর প্রত্যাহার এবং নতুন প্রকল্পগুলোতে কর অবকাশ (Tax Holiday) প্রদান করলে বেসরকারি বিনিয়োগ উৎসাহিত হবে। বিদ্যুৎ সঞ্চালন ও বিতরণে ডিজিটালাইজেশন এবং ব্যাটারি স্টোরেজ প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ বাড়ালে বাংলাদেশের জ্বালানি খাত নতুন করে ঘুরে দাঁড়াতে পারবে। এখন সময় এসেছে আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে নিজস্ব ও টেকসই শক্তির উৎসকে অগ্রাধিকার দেওয়ার, যা কেবল অর্থনীতি নয়, বরং দেশের সার্বভৌমত্ব ও উন্নয়নকে আরও সুসংহত করবে।

