ভারত সীমান্ত সংলগ্ন কৌশলগত বিমানঘাঁটিগুলোতে পঞ্চম প্রজন্মের জে-২০ ‘মাইটি ড্রাগন’ স্টেলথ যুদ্ধবিমানের উপস্থিতি উল্লেখযোগ্য হারে বাড়িয়েছে চীন। সাম্প্রতিক স্যাটেলাইট চিত্রের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, লাদাখ ও অরুণাচল প্রদেশ সীমান্তের কাছাকাছি দুটি গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটিতে একসাথে অন্তত এগারোটি জে-২০ যুদ্ধবিমান অবস্থান করছে। আন্তর্জাতিক প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, ভারতের উত্তর সীমান্তে বেইজিংয়ের এই সামরিক শক্তি বৃদ্ধি নতুন এক কৌশলগত বাস্তবতার জন্ম দিয়েছে, যা নয়াদিল্লির প্রতিরক্ষা নীতিনির্ধারকদের নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে।
বিশ্বস্ত সূত্রে প্রাপ্ত স্যাটেলাইট চিত্র অনুযায়ী, চলতি বছরের জুলাই মাসের প্রথম সপ্তাহে শিনজিয়াং অঞ্চলের হোতান বিমানঘাঁটিতে সাতটি এবং তিব্বতের দামশুং বিমানঘাঁটিতে চারটি জে-২০ যুদ্ধবিমান মোতায়েন করা হয়েছে। এর মধ্যে লাদাখের কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ দৌলত বেগ ওল্ডি বিমানঘাঁটি থেকে মাত্র ২৪৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত হোতান ঘাঁটিটি বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারতীয় সীমানার এত কাছাকাছি চীনা বিমানঘাঁটিতে একসঙ্গে এত বিপুল সংখ্যক পঞ্চম প্রজন্মের স্টেলথ যুদ্ধবিমানের উপস্থিতি এই অঞ্চলে এ পর্যন্ত রেকর্ড করা হয়েছে।
ভারতের খ্যাতনামা প্রতিরক্ষা গবেষণা প্রতিষ্ঠান নিউস্পেসের সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক যুদ্ধবিমানচালক সমীর যোশীর মতে, উত্তরাঞ্চলীয় সীমান্তে চীনের অত্যাধুনিক স্টেলথ বিমানের নিয়মিত উপস্থিতি এখন দৃশ্যমান বাস্তবতা। এই পরিস্থিতির মোকাবিলায় ভারতের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে আরও আধুনিক ও শক্তিশালী করা জরুরি হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে, দূরপাল্লার রাডার শনাক্তকরণ প্রযুক্তি এবং সমন্বিত আকাশ সুরক্ষা বলয় গড়ে তোলার ওপর জোর দিচ্ছেন কৌশলগত বিশেষজ্ঞরা। জে-২০ যুদ্ধবিমানের মূল শক্তি এর স্টেলথ বা রাডার ফাঁকি দেওয়ার প্রযুক্তি, যা শত্রুর নজরে আসার আগেই আক্রমণ চালাতে সাহায্য করে। ফলে প্রচলিত রাডারে এগুলোকে ট্র্যাক করা অত্যন্ত কঠিন, যা ভারতের বর্তমান বিমানবহরের জন্য বড় ধরনের কৌশলগত চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।
অন্যদিকে, ভারতের নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি পঞ্চম প্রজন্মের স্টেলথ যুদ্ধবিমান ‘অ্যাডভান্সড মিডিয়াম কমব্যাট এয়ারক্রাফট’ বা এএমসিএ (AMCA) বর্তমানে উন্নয়ন ও পরীক্ষামূলক পর্যায়ে রয়েছে। সামরিক বিশেষজ্ঞদের ধারণা, এই দেশীয় যুদ্ধবিমানটি ভারতীয় বিমানবাহিনীর বহরে যুক্ত হতে আরও অন্তত এক দশক সময় লাগতে পারে। ফলে মধ্যবর্তী সময়ে চীনের এই আকাশ আধিপত্য মোকাবিলায় ভারতকে অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বন করতে হচ্ছে। আন্তর্জাতিক প্রতিরক্ষা গবেষণা প্রতিষ্ঠান রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউট (RUSI)-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সালে চীনের বহরে প্রায় ৫০টি জে-২০ যুদ্ধবিমান থাকলেও ২০২২ সালের শেষ নাগাদ তা বেড়ে দাঁড়ায় দুই শতাধিক। বর্তমানে বিভিন্ন গোয়েন্দা ও প্রতিরক্ষা সূত্রের হিসাবে চীনা পিপলস লিবারেশন আর্মি এয়ার ফোর্সের (PLAAF) কাছে প্রায় ৩০০ থেকে ৫০০টি জে-২০ রয়েছে এবং ২০৩০ সালের মধ্যে এই সংখ্যা এক হাজারে পৌঁছাতে পারে।
ভারতের সাবেক বিমানবাহিনীর উপপ্রধান এয়ার মার্শাল নর্মদেশ্বর তিওয়ারি মন্তব্য করেছেন যে, প্রতি বছর শতাধিক জে-২০ উৎপাদনের সক্ষমতা চীনের শক্তিশালী সামরিক উৎপাদন খাত এবং সমন্বিত সরবরাহ শৃঙ্খলেরই প্রতিফলন। দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনা এবং প্রতিরক্ষা খাতে বিশাল বিনিয়োগের ফলেই চীন আজ এই প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে ভারতীয় বিমানবাহিনী তাদের সক্ষমতা বাড়াতে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। বাহিনীর হাতে ইতোমধ্যে ৩৬টি রাফাল যুদ্ধবিমান রয়েছে। এছাড়া নৌবাহিনীর জন্য ২৬টি রাফাল ক্রয়ের প্রক্রিয়া এবং বিমানবাহিনীর জন্য অতিরিক্ত ১১৪টি রাফাল যুদ্ধবিমান কেনার বিষয়েও আলোচনা চলছে। পাশাপাশি, ২৬০টির বেশি সুখোই-৩০ এমকেআই, মিরাজ-২০০০ এবং মিগ-২৯ যুদ্ধবিমানের একটি বড় বহর আকাশ সুরক্ষায় নিয়োজিত রয়েছে। তবে সীমান্তে এই নতুন উত্তেজনার বিষয়ে ভারতীয় বিমানবাহিনীর পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো মন্তব্য করা হয়নি।

