আধুনিক শহুরে জীবনের জটিলতা, ব্যক্তিগত সম্পর্কের টানাপোড়েন এবং মনের ভেতর লুকিয়ে থাকা অপরাধবোধ ও অনুশোচনার এক নিখুঁত চিত্র ফুটে উঠেছে সম্প্রতি ঘটে যাওয়া একটি ঘটনায়। কর্মক্ষেত্র থেকে শুরু করে ব্যক্তিগত জীবন—সবখানেই যেন এক অস্থিরতার ছোঁয়া লেগে রয়েছে। বর্তমান সময়ের যান্ত্রিক ও প্রতিযোগিতাপূর্ণ জীবনে মানুষের মানসিক শান্তি যেন এক দুর্লভ বস্তুতে পরিণত হয়েছে। সম্পর্কের সমীকরণে বারবার হোঁচট খাওয়ার ঘটনা নতুন কিছু নয়, তবে এর পেছনের মনস্তাত্ত্বিক কারণগুলো অনেক সময়ই গভীর ক্ষত তৈরি করে।
ঘটনার সূত্রপাত রাজীব নামের এক যুবকের ব্যক্তিগত জীবনকে কেন্দ্র করে। দীর্ঘদিন ধরে নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে চলা রাজীবের জীবনে নতুন করে ঝড় তোলে এক অভাবনীয় পরিস্থিতি। তার পরিচিত এক সহকর্মীর মাধ্যমে সে শরণাপন্ন হয় এক জ্যোতিষীর। জীবনের না বলা কথা এবং মনের ভেতরের অপরাধবোধ যেন অলৌকিকভাবে ধরে ফেলেন সেই জ্যোতিষী। জীবনানন্দ দাশের কবিতার পঙক্তি দিয়ে শুরু হওয়া সেই আলাপে স্পষ্ট হয়ে ওঠে মানুষের অন্তরের লুক্কায়িত বেদনা এবং দীর্ঘশ্বাসের অভিশাপ। রাজীবের মনের ভেতর তখন তোলপাড় চলছে এক বিশেষ ঘটনাকে কেন্দ্র করে, যা সে কারো সঙ্গেই ভাগ করে নিতে পারছে না।
ঘটনার মূলে রয়েছে রাজীবের বাসায় পড়তে আসা এক তরুণী, যার নাম পুনর্ভবা বসু ওরফে রিণী। সে রাজীবদের বাড়ির দারোয়ান নগেনের মেয়ে এবং বিজ্ঞান বিভাগে দ্বাদশ শ্রেণীতে অধ্যয়নরত এক মেধাবী ছাত্রী। অর্থনৈতিক অসচ্ছলতার কারণে যেখানে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়াটাই একটি বড় চ্যালেঞ্জ, সেখানে রিণী তার অদম্য মেধার জোরে এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ অর্জন করেছিল। তার এই মেধা দেখে রাজীব নিজেই তাকে পড়াশোনায় সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল। কিন্তু সম্প্রতি বর্ষার এক সন্ধ্যায় ঘটে যায় এক অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা। বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে পড়তে আসা রিণীর আবেগঘন মুহূর্তের বহিঃপ্রকাশ রাজীবের রক্ষণশীল মানসিকতায় তীব্র ভয়ের জন্ম দেয়। সামাজিক ব্যবধান ও মর্যাদার কথা চিন্তা করে রাজীব তাৎক্ষণিকভাবে রিণীকে কঠোরভাবে প্রতিহত করে এবং ঘর থেকে বের করে দেয়।
নিজের সামাজিক মর্যাদা ও মানসম্মান রক্ষার মোহে অন্ধ হয়ে রাজীব পরের দিনই রিণীর বাবা নগেনকে চাকরিচ্যুত করে। অসহায় এক দরিদ্র পিতার আকুতি এবং একটি মেয়ের উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন ধূলিসাৎ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হলেও রাজীবের মনে তখন কাজ করছিল শুধু এক ধরণের আত্মরক্ষা বা ভীতি। কিন্তু অপরাধবোধের গ্লানি তাকে এক মুহূর্তের জন্যও শান্তি দেয়নি। পরবর্তীতে রিণীর মহত্ত্ব এবং নিজের ভুল বুঝতে পেরে রাজীবের ভেতর এক গভীর অনুশোচনার জন্ম নেয়। পরিশেষে, সে তার ভুল সংশোধন করে নগেনকে কাজে বহাল করার সিদ্ধান্ত নেয় এবং রিণীর কোচিংয়ের দায়িত্ব গ্রহণ করে। এই মানবিক সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে তার মনে ফিরে আসে এক পরম প্রশান্তি, যা শহুরে যান্ত্রিকতার ভিড়ে হারিয়ে যাওয়া মানবতাবোধেরই এক অনন্য দৃষ্টান্ত।

