চলচ্চিত্র কেবল বিনোদনের মাধ্যম নয়, বরং এটি সমসাময়িক সমাজ ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের এক শক্তিশালী দলিল। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ঘটে যাওয়া ঐতিহাসিক পরিবর্তনের ছায়া নিয়ে নির্মিত হয়েছে মোহাম্মদ তাওকীর ইসলামের প্রশংসিত চলচ্চিত্র ‘দেলুপি’। গত মঙ্গলবার বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় নাট্যশালার মূল মিলনায়তনে ছবিটির একটি বিশেষ উন্মুক্ত প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়। প্রদর্শনীটি কেবল একটি চলচ্চিত্র প্রদর্শনীর মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং এটি রূপ নেয় জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থান এবং সমসাময়িক রাজনৈতিক গতিপ্রকৃতি নিয়ে এক বুদ্ধিবৃত্তিক ও গভীর তাত্ত্বিক আলোচনায়।
প্রদর্শনী পরবর্তী ‘জুলাইয়ের গণ–অভ্যুত্থান ও চলচ্চিত্রের রাজনৈতিক ভূমিকা’ শীর্ষক এই সংলাপে দেশের প্রথিতযশা বুদ্ধিজীবী, কবি, লেখক, শিক্ষক ও চলচ্চিত্র সমালোচকরা অংশ নেন। আলোচকদের মতে, ‘দেলুপি’ সিনেমাটি ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশের সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতার এক অসামান্য ও প্রামাণিক দলিল। ছবিটির সার্বিক ক্যানভাসে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে এমন একটি কালখণ্ড, যা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলের নানামুখী ঘটনাপ্রবাহ, প্রান্তিক মানুষের জীবনসংগ্রাম এবং ক্ষমতার পালাবদলের পরও কাঠামোগত পরিবর্তনের অভাবকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরে।
আলোচনায় অংশ নিয়ে বিশিষ্ট কবি ও প্রথম আলোর নির্বাহী সম্পাদক সাজ্জাদ শরিফ বলেন, সিনেমাটিতে ওই বিশেষ সময়ের নিখুঁত চিহ্ন বা প্রতিচ্ছবি বিদ্যমান। ‘দেলুপি’র রূপক কাঠামোর কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এই সিনেমাকে একটি নির্দিষ্ট গ্রামের গণ্ডির মধ্যেও দেখা যেতে পারে, আবার বৃহত্তর বাংলাদেশের প্রতীক হিসেবেও বিবেচনা করা যেতে পারে। যেখানে ক্ষমতার পটপরিবর্তন ঘটলেও সাধারণ মানুষের ভাগ্য কিংবা দীর্ঘমেয়াদী ব্যবস্থার মৌলিক কোনো রূপান্তর সাধিত হয়নি। এই চলচ্চিত্রে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মেয়াদের ঘটনাবলি, সমাজে সংখ্যালঘুদের অবস্থান এবং সামগ্রিক সংস্কৃতিচর্চার বাস্তব চিত্র অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। ভবিষ্যতে যখনই গবেষক বা সাধারণ মানুষ জুলাই আন্দোলনের প্রকৃত চিত্র অনুসন্ধান করতে চাইবেন, তখন এই চলচ্চিত্রটি একটি অবধারিত ও গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক সূত্র হিসেবে কাজ করবে।
নিউ এজ পত্রিকার সম্পাদক ও বিশিষ্ট লেখক নূরুল কবির তাঁর বক্তব্যে উল্লেখ করেন, বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম বড় বাঁক পরিবর্তন—জুলাই অভ্যুত্থানের মূল স্পিরিট, এর অন্তর্নিহিত তাৎপর্য এবং ঐতিহাসিক গতিপ্রকৃতি বা মোমেন্টামকে অত্যন্ত সফলভাবে পর্দায় ধারণের চেষ্টা করেছেন নির্মাতা। গণমানুষের প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির সমীকরণে ছবিটির শৈল্পিক আবেদন সুদূরপ্রসারী বলে তিনি মন্তব্য করেন।
ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের অধ্যাপক বখতিয়ার আহমেদ সিনেমাটির নান্দনিক ও রাজনৈতিক স্বাতন্ত্র্য তুলে ধরে বলেন, ‘দেলুপি’ অত্যন্ত সহজ, সরল ও অকপট এক শিল্পকর্ম। প্রচলিত ধারার কেন্দ্রাতিগ রাজনৈতিক বয়ানের বাইরে গিয়ে এটি সাধারণ মানুষের মাইক্রোসোশ্যাল বা ক্ষুদ্র সামাজিক পরিস্থিতিগুলোকে সামনে নিয়ে এসেছে। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর দৃষ্টিভঙ্গি থেকে অনেক সময় সমাজের লুকানো সত্য আরও স্পষ্টভাবে উন্মোচিত হয়। চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের কোনো গতানুগতিক বড় বয়ান বা গ্র্যান্ড ন্যারেটিভ এখানে চাপিয়ে দেওয়া হয়নি; বরং রোদে পোড়া, কাদাজলে ভেজা সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের ক্ষুদ্র অথচ অকাট্য সত্যগুলো এখানে মূর্ত হয়ে উঠেছে।
প্রেস ইনস্টিটিউট বাংলাদেশের (পিআইবি) সহযোগী অধ্যাপক মনিরা শরমিন মনে করেন, জুলাই অভ্যুত্থানের সমাপ্তি বিন্দু থেকেই এই চলচ্চিত্রের মূল যাত্রার শুরু। ভবিষ্যতের ইতিহাসবিদরা যখন চব্বিশের অভ্যুত্থানের প্রামাণ্য ইতিহাস রচনা করবেন, তখন ‘দেলুপি’ চলচ্চিত্রটিকে এড়িয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ থাকবে না। জুলাই আন্দোলনের মূল সুরটিকে ধারণ করে নির্মিত এই চলচ্চিত্রে জেন-জি বা তরুণ প্রজন্মের রাষ্ট্র সংস্কারের স্বপ্ন ও আকাঙ্ক্ষার বাস্তব প্রতিফলন দেখতে পাওয়া যায়।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকি। তিনি মঞ্চে তাঁর বক্তৃতায় বলেন, যেকোনো জনরোষ ও গণআন্দোলন মানুষকে ভেতর থেকে রূপান্তরিত করে তোলে এবং নতুন মানুষে পরিণত করে। হয়তো চলচ্চিত্রের চরিত্রগুলোর মধ্যেও সেই অভ্যন্তরীণ পরিবর্তনের ও জাগরণের ইঙ্গিত রয়েছে। এছাড়া সংস্কৃতিবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম এবং শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক শেখ রেজাউদ্দিন আহমেদসহ দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের বহু বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব এই উন্মুক্ত প্রদর্শনীতে উপস্থিত ছিলেন।
সিনেমাটির প্রদর্শনী শেষে পরিচালক মোহাম্মদ তাওকীর ইসলাম কুশলীদের সঙ্গে নিয়ে মঞ্চে আসেন এবং দর্শকদের অভূতপূর্ব সাড়ায় কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বলেন, তাদের প্রধান ও একমাত্র লক্ষ্য হলো এই চলচ্চিত্রটি দেশের আরও বেশি সংখ্যক দর্শকের কাছে পৌঁছে দেওয়া। ওয়ার্ল্ড সিনে সার্কেল, সিনেফিল সোসাইটি বাংলাদেশ এবং সুন্দরবন ফিল্ম সোসাইটির যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এই পুরো অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন বাংলাদেশ ফেডারেশন অব ফিল্ম সোসাইটির সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ নুর উল্লাহ। গত বছরের ৭ নভেম্বর প্রেক্ষাগৃহে মুক্তির পর থেকেই দর্শক ও সমালোচকদের কাছ থেকে ধারাবাহিক প্রশংসা কুড়িয়ে আসছে ‘দেলুপি’ নামের এই রাজনৈতিক চলচ্চিত্রটি।

