হিমালয়কন্যা নেপালে সাম্প্রতিক সময়ে ঘটা হিন্দু ও মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যকার রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনায় দেশজুড়ে চরম উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা বিরাজ করছে। দেশটির দক্ষিণাঞ্চলে বিগত কয়েক দিন ধরে চলা দফায় দফায় এই সহিংসতায় অন্তত তিনজন নিহত হয়েছেন। পরিস্থিতি মারাত্মক আকার ধারণ করায় এবং তা সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ার উপক্রম হওয়ায় জাতির উদ্দেশে জরুরি ভাষণ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ। গত মার্চ মাসে দায়িত্ব গ্রহণের পর জনসমক্ষে এটিই ছিল তাঁর প্রথম বড় ধরনের আনুষ্ঠানিক ভাষণ। দীর্ঘ নীরবতা ভেঙে তিনি দেশের সর্বস্তরের জনসাধারণকে ধৈর্য, সংযম ও পারস্পরিক সম্প্রীতি বজায় রাখার বিনীত আহ্বান জানিয়েছেন।
পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ভারত সীমান্তবর্তী সুনসারি জেলার একটি প্রত্যন্ত গ্রামে গত রোববার এই সহিংসতার সূত্রপাত ঘটে। হিন্দুদের একটি ধর্মীয় শোভাযাত্রা চলাকালে উচ্চস্বরে গান বাজানো এবং ধর্মীয় পতাকা উত্তোলনকে কেন্দ্র করে স্থানীয় মুসলিম জনগোষ্ঠীর সঙ্গে বাকবিতণ্ডা শুরু হয়। মুহূর্তের মধ্যেই সেই কথাকাটাকাটি রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে রূপ নেয়। দুই পক্ষের সংঘর্ষ থামাতে এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ বাধ্য হয়ে গুলি চালায়, যার ফলে ঘটনাস্থলেই দুজন নিহত হন। পরবর্তীতে পার্শ্ববর্তী সিরাহা জেলায় প্রশাসনের জারি করা কারফিউ অমান্য করে বিক্ষোভ প্রদর্শনের সময় সংঘর্ষে আরও একজন মারা যান।
পরিস্থিতির আরও অবনতি রোধ করতে স্থানীয় প্রশাসন সুনসারি ও তার আশপাশের সংবেদনশীল জেলাগুলোতে কঠোর কারফিউ ও ১৪৪ ধারা জারি করেছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে এবং জানমালের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে মোতায়েন করা হয়েছে অতিরিক্ত পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনী। পুলিশের মুখপাত্র আবি নারায়ণ কাফ্লে গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, দেশের সব পুলিশ সদস্যকে সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থায় রাখা হয়েছে। তাঁদের মূল লক্ষ্য হলো ন্যূনতম বলপ্রয়োগের মাধ্যমে জনজীবন নিরাপদ রাখা এবং যেকোনো মূল্যে উগ্রপন্থী তৎপরতা ও সংঘাত নিয়ন্ত্রণ করা।
জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ অত্যন্ত জোরালো ভাষায় বলেন, ‘আসুন, আমরা সবাই মিলে এই অশান্তির মেঘ দূর করি।’ তিনি সরকারের পক্ষ থেকে দেশের সব নাগরিক, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি, বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের গুরু, রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী এবং দায়িত্বশীল গণমাধ্যমের প্রতি শান্ত থাকার অনুরোধ জানান। প্রধানমন্ত্রী স্পষ্ট ভাষায় উল্লেখ করেন যে, দেশে শান্তি, সম্প্রীতি, ভ্রাতৃত্ববোধ এবং জাতীয় ঐক্য রক্ষা করাই বর্তমান সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। এছাড়া, পুরো ঘটনার একটি নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ ও সুষ্ঠু তদন্তের জোরালো প্রতিশ্রুতি দিয়ে তিনি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন যে, এই অনভিপ্রেত সহিংসতার পেছনে যারাই মদদ জোগাক না কেন, তাদের আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করা হবে।
উল্লেখ্য, নেপালের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৮০ শতাংশ মানুষ হিন্দুধর্মাবলম্বী হলেও দেশটির দক্ষিণাঞ্চলীয় তরাই বা মদেশীয় অঞ্চলে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মুসলিম জনগোষ্ঠীর বসবাস রয়েছে। অতীতেও এই অঞ্চলে বিভিন্ন ছোটখাটো সামাজিক বা ধর্মীয় ইস্যুকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে, তবে এবারের সংঘর্ষের মাত্রা ও প্রাণহানির ঘটনা দীর্ঘদিন পর দেশটিতে বড় ধরনের ধর্মীয় মেরুকরণের আশঙ্কা তৈরি করেছে। বর্তমান প্রশাসন যেকোনো মূল্যে এই সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষা করতে এবং বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে বদ্ধপরিকর।

