আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাত থেকে বাঁচতে অভিনব এক পন্থার আশ্রয় নিয়েছিলেন এক ব্যক্তি। মদ্যপ অবস্থায় গাড়ি চালানোর অপরাধ এবং ঋণের বোঝা থেকে মুক্তি পেতে নিজের মৃত্যুর ভুয়া নাটক সাজান তিনি। পরিবারের সদস্যদের সহযোগিতায় কফিন কিনে তার ভেতর শুয়ে আত্মগোপনের এই ঘটনা বিশ্বজুড়ে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে। কফিনবন্দি হয়ে মৃত্যুর অভিনয় করেও শেষ রক্ষা হয়নি সেই চীনা নাগরিকের। প্রযুক্তি ও তথ্যের আধুনিক ব্যবহারের কল্যাণে পুলিশের জালে ধরা পড়তে হয়েছে তাকে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, অভিযুক্ত ওই ব্যক্তির পারিবারিক পদবি সি। চীনের হেনান প্রদেশের আনিয়াং শহরের বাসিন্দা সি গত বছরের জানুয়ারি মাসে মাতাল অবস্থায় গাড়ি চালানোর দায়ে পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হন। তদন্তে বেরিয়ে আসে, এটিই তার প্রথম অপরাধ নয়; এর আগেও দুবার তিনি লাইসেন্স ছাড়া এবং মদ্যপ অবস্থায় গাড়ি চালিয়ে আইন লঙ্ঘন করেছিলেন। বারবার একই অপরাধের পুনরাবৃত্তি করায় তার বিরুদ্ধে কঠোর আইনি প্রক্রিয়া শুরু হয়। সর্বশেষ গ্রেপ্তারের পর তিনি জামিনে মুক্ত থাকলেও মাথার ওপর ঝুলছিল বড় অঙ্কের ঋণের বোঝা এবং বিচারাধীন মামলার দীর্ঘসূত্রতা। এই বহুমুখী চাপ থেকে চিরতরে মুক্তি পাওয়ার শর্টকাট রাস্তা খুঁজতে গিয়ে তিনি নিজের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করেন।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, গত বছরের জুন মাসে সি একটি কফিন সংগ্রহ করেন। নিজের ঘরে প্রচুর খালি ওষুধের বোতল ছড়িয়ে রেখে তিনি বোঝানোর চেষ্টা করেন যে তিনি অতিরিক্ত ওষুধ সেবন করে আত্মহত্যা করেছেন। কফিনের ভেতর নিশ্বাস আটকে শুয়ে থাকার পাশাপাশি মৃতদেহের মতো শরীর ঠান্ডা রাখার জন্য বিশেষ ‘কুলিং ইকুইপমেন্ট’ বা শীতলীকরণ যন্ত্র ব্যবহার করা হয়। এরপর তাঁর পরিবারের সদস্যরা নাটকীয়ভাবে দাবি করতে শুরু করেন যে মাত্রাতিরিক্ত ওষুধ খেয়ে সি মারা গেছেন। মুখমণ্ডলে বিকৃতি ঘটার কথা বলে একটি অজুহাত তৈরি করা হয়, যাতে কেউ কফিন খুলে মুখ দেখতে না পারে। সূর্যাস্তের আগেই পরিবারের প্রবীণ সদস্য, অর্থাৎ তাঁর মা ও দাদি তড়িঘড়ি করে কফিনটি কবরস্থ করেন। কিন্তু আসল সত্য ছিল ভিন্ন—যে কফিনটি মাটিচাপা দেওয়া হয়েছিল, তার ভেতর সি ছিলেন না।
দাফনের আনুষ্ঠানিকতা সেরে সি তাৎক্ষণিকভাবে বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যান। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিতে তিনি নিজ প্রদেশ থেকে শত শত কিলোমিটার দূরে দক্ষিণ-পশ্চিম চীনের ইউনান প্রদেশে গিয়ে আত্মগোপন করেন। তবে পুলিশের অভিজ্ঞ তদন্তকারীদের মনে এই পুরো ঘটনাটি নিয়ে গভীর সন্দেহের সৃষ্টি হয়। পুলিশ কর্মকর্তারা লক্ষ্য করেন, মৃত্যুর পর কোনো ধরনের জরুরি চিকিৎসা সেবা বা অ্যাম্বুলেন্সের জন্য কল করা হয়নি। এছাড়া তড়িঘড়ি করে কফিন কেনা, কোনো ধরনের আনুষ্ঠানিক মৃত্যুসনদ বা চিকিৎসকের ডেথ সার্টিফিকেট না থাকা এবং মা ও দাদি ছাড়া অন্য কোনো স্বজনের মৃতদেহ দেখার সুযোগ না পাওয়ায় তদন্তকারীদের সন্দেহ আরও ঘনীভূত হয়।
তদন্তের অংশ হিসেবে পুলিশ আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্য নেয়। সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ, ব্যাংক হিসাবের লেনদেন এবং মোবাইল ফোনের কল ডেটা রেকর্ড (সিডিআর) যাচাই করে পুলিশ নিশ্চিত হয় যে সি মারা যাননি, বরং তিনি বেঁচে আছেন এবং ইউনান প্রদেশে অবস্থান করছেন। এরপর চলতি বছরের এপ্রিল মাসে পুলিশ অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেপ্তার করে। সম্প্রতি আদালত এই চাঞ্চল্যকর মামলার রায় ঘোষণা করেছে। জালিয়াতি ও বিচার এড়ানোর চেষ্টার অভিযোগে আদালত সি-কে পাঁচ মাসের কারাদণ্ড এবং ২০ হাজার ইউয়ান জরিমানা করেছে। পাশাপাশি, অপরাধীকে পালিয়ে যেতে এবং ভুয়া মৃত্যু নাটক সাজাতে সরাসরি সহায়তা করার দায়ে ওই ব্যক্তির মা ও দাদির বিরুদ্ধেও পৃথক তদন্ত শুরু করেছে স্থানীয় পুলিশ। অপরাধ বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এ ধরনের ভুয়া মৃত্যুর ঘটনা আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে বিভ্রান্ত করার একটি নজিরবিহীন প্রচেষ্টা, যা শেষ পর্যন্ত ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছে।

