গরম দুধে সামান্য পুরোনো দই মিশিয়ে কয়েক ঘণ্টা রেখে দিলে জমে যায় সুস্বাদু দই—এই সহজ কৌশলটি অনেকেরই জানা। তবে এই সাধারণ প্রক্রিয়ার পেছনে লুকিয়ে রয়েছে এক ঐতিহাসিক ও বৈজ্ঞানিক কৌতুহল। যদি দই তৈরি করতে পূর্বের জমানো দই বা ‘বীজ’ আবশ্যক হয়, তবে পৃথিবীর ইতিহাসে একদম প্রথম দইটি কীভাবে তৈরি হয়েছিল? গবেষক ও খাদ্য-ইতিহাসবিদদের মতে, মানুষের এই প্রিয় খাবারের জন্ম কোনো পরিকল্পিত পরীক্ষার মাধ্যমে হয়নি, বরং এটি ছিল এক যুগান্তকারী আকস্মিক ঘটনা।
লিখিত ইতিহাস শুরু হওয়ারও বহু হাজার বছর পূর্বে মানবসমাজ যখন পশুর চামড়া দিয়ে তৈরি থলিতে দুধ সংরক্ষণ করতে শুরু করে, ঠিক তখনই দইয়ের আদি সূচনা ঘটে। পশুর চামড়ায় প্রাকৃতিকভাবেই বাস করত একধরনের উপকারী অণুজীব বা ব্যাকটেরিয়া। থলিতে থাকা তরল দুধের সঙ্গে এসব ব্যাকটেরিয়ার স্বাভাবিক রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটে, যার ফলে দুধ জমে গিয়ে ঘন ও টক স্বাদের নতুন এক খাদ্যে রূপান্তরিত হয়। প্রাথমিক অবস্থায় মানুষ অণুজীব সম্পর্কে সম্পূর্ণ অজ্ঞ থাকলেও তারা লক্ষ্য করে যে, চামড়ার পাত্রে দুধ রাখলেই তা দ্রুত জমে যায়। পরবর্তীতে পাত্রের তলায় লেগে থাকা পুরোনো দইয়ের অবশিষ্টাংশে নতুন দুধ ঢাললে জমানোর প্রক্রিয়াটি আরও দ্রুত ও নিখুঁত হয়। এভাবেই অভিজ্ঞতার আলোকেই মানবজাতি দই থেকে নতুন দই তৈরির প্রাচীন কৌশল আয়ত্ত করে।
ভাষাগত ও ভৌগোলিক দিক থেকেও দইয়ের অতীত বেশ সমৃদ্ধ। আধুনিক ‘ইয়োগার্ট’ শব্দটির মূল উৎস তুর্কি শব্দ ‘ইয়োগ’, যার অর্থ হলো কোনো তরল পদার্থকে ঘন বা জমাটবদ্ধ করা। ষোলো শতকে ভ্রমণকাহিনিতে ইংরেজিতে এর উল্লেখ পাওয়া গেলেও রোমান দার্শনিক প্লিনি দ্য এল্ডারের প্রাচীন লেখায় খ্রিষ্টীয় প্রথম শতকেই দুধ জমিয়ে খাওয়ার বর্ণনার সন্ধান মেলে। গবেষণায় দেখা যায়, আনাতোলিয়ার ছাগলপালকেরা থলিতে দুধ জমিয়ে প্রথম এই প্রক্রিয়ার সুফল পেয়েছিলেন। এছাড়া খ্রিষ্টপূর্ব ৬০০০ অব্দে প্রাচীন ভারতীয় আয়ুর্বেদ গ্রন্থেও দুধ জমাট বেঁধে তৈরি খাবারের অনন্য স্বাস্থ্যকারিতার উল্লেখ রয়েছে।
ইতিহাসের নানা গৌরবময় অধ্যায়েও দইয়ের উপস্থিতি লক্ষণীয়। মঙ্গোল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা চেঙ্গিস খান তাঁর সৈন্যদের শক্তি ও মনোবল বৃদ্ধি করতে নিয়মিত দই পরিবেশন করতেন। আবার ১৫৪২ সালে ফ্রান্সের রাজা প্রথম ফ্রাঁসোয়া যখন মারাত্মক পেটের পীড়ায় ভুগছিলেন, তখন এক তুর্কি চিকিৎসকের পরামর্শে দই খেয়ে তিনি আরোগ্য লাভ করেন। এই ঘটনার পরই পশ্চিম ইউরোপজুড়ে দইয়ের ব্যাপক প্রসার ঘটে এবং ধীরে ধীরে এতে মধু ও ফল মিশিয়ে সুস্বাদু ডেজার্ট তৈরির প্রচলন শুরু হয়।
বিংশ শতাব্দীর শুরুতে দইয়ের পেছনের গূঢ় বিজ্ঞান উন্মোচিত হতে শুরু করে। বুলগেরীয় চিকিৎসা বিজ্ঞানী স্টামেন গ্রিগভ প্রথম শনাক্ত করেন যে, দই জমানোর নেপথ্যে প্রধান ভূমিকা পালন করে ‘ল্যাকটোব্যাসিলাস বুলগারিকাস’ নামের ব্যাকটেরিয়া। পরবর্তীতে নোবেল বিজয়ী বিজ্ঞানী এলি মেচনিকফ প্রমাণ করেন, বুলগেরিয়ার গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর দীর্ঘায়ু ও সুস্থতার মূল চাবিকাঠি ছিল নিয়মিত দই খাওয়া। এই ব্যাকটেরিয়াগুলো দুধে ল্যাকটিক অ্যাসিড তৈরি করে ক্ষতিকর অণুজীব ধ্বংস করে এবং পরিপাকতন্ত্রকে সুস্থ রাখে। এর ফলশ্রুতিতে ইউরোপে ফার্মেসিগুলোতে ওষুধ হিসেবেও দই বিক্রির প্রচলন শুরু হয়।
পরবর্তীকালে ১৯১৯ সালে আইজ্যাক ক্যারাসো দইয়ের সঙ্গে ফল ও জ্যাম মিশিয়ে বাণিজ্যিক বিপণন শুরু করেন। তাঁরই উত্তরাধিকারী ড্যানিয়েল ১৯৩২ সালে ফ্রান্সে প্রতিষ্ঠা করেন বিখ্যাত দুগ্ধজাত পণ্য প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান ‘ড্যানোন’। আধুনিক যুগেও প্রাকৃতিক উপায়ে দই তৈরিতে ‘ল্যাকটোব্যাসিলাস’ ও ‘স্ট্রেপ্টোকোকাস’ জাতীয় উপকারী অণুজীব ব্যবহার করা হয়, যা দুধের ল্যাকটোজ ভেঙে ল্যাকটিক অ্যাসিড প্রস্তুত করে। তবে বর্তমানে সুপারমার্কেটে প্রক্রিয়াজাত রাসায়নিক ও স্টেবিলাইজার যুক্ত দই পাওয়া গেলেও ঘরে তৈরি খাঁটি দই-ই স্বাস্থ্য সুরক্ষায় সবচেয়ে কার্যকর ভূমিকা পালন করে।

